Story
আমরা অনেকেই বিখ্যাত শিল্পীদের সৃষ্টির দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকি। কিন্তু বাংলার নিজস্ব শিল্পের যে বিশাল ভাণ্ডার রয়েছে, সেটা কখনও ওলটপালট করে দেখা হয়ে ওঠে না। ঐতিহ্য, কৃষ্টি, সংস্কৃতি এবং শিল্পের আধার এই গ্রাম-বাংলা। নিজের নিজের ক্ষেত্রে তারা প্রত্যেকেই সেরা। গ্রাম বাংলার আনাচে-কানাচে ঢুঁ মারলে, সেই খোঁজ আপনিও পেতে পারেন। কুটির শিল্প এ বাংলার অহংকার।
পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলা। ডোকরা, বালুচুরি আর শঙ্খ শিল্পের বাইরে বেড়িয়েও বাঁকুড়া জেলার অন্দরমহল আরও প্রচুর প্রচুর কুটির শিল্পে সমৃদ্ধ। সভ্যতার অগ্রগতিতে কত কত শিল্পী যে প্রচ্ছন্ন হয়ে গিয়েছে, তার হিসেব নেই। এই যেমন বাঁকুড়া জেলার দারু শিল্প। কাঠের শিল্পকর্ম- যা স্থানীয় ভাষায় দারুশিল্প হিসেবেই পরিচিত।
কাঠের থালা, বাটি, ট্রে ইত্যাদি বানিয়েই যারা রুজিরুটির জোগাড় করেন, তাদেরই একজন কানাইলাল চক্রবর্তী। নেশায় হোক বা পেশায় তিনি একজন শিল্পী, যার হাতে তৈরি হচ্ছে এই সমস্ত জিনিসপত্র। ইদানিংকালে কাঠের তৈরি এই সমস্ত নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আবার বিলাসব্যসনের চিহ্ন বহন করে। ঘরসাজানো হোক, খাবার সার্ভ করাই হোক, অথবা সখের কালারফুল ডিজাইন তৈরিই হোক।
গ্রাম-বাংলার প্রত্যন্ত এই শিল্পীর তৈরি জিনিস একটা সময় বিদেশে এক্সপোর্ট হত। নয় নয় করে ২৫ জনের মাথায় রোজগারের ছাতা ধরেছিলেন এই শিল্পী। বহু নামী ব্যবসায়ী তার থেকে পাইকারি দামে কাঠের ইউটেন্সিলস নিয়ে গিয়ে সেগুলোকে রঙিনভাবে সাজিয়ে পৌঁছে দিয়েছেন বিশ্বের দরবারে। যে শিল্পীর শিল্পের ইতিহাস এত উজ্জ্বল, আজ তিনি কেমন আছেন, একবার জেনে নিন।
কানাইলাল বাবুর মত শিল্পীরা আছেন বলে এই শিল্পটা বেঁচে আছে। নইলে নতুন প্রজন্ম তো ফিরেও দেখছে না। দেখবেই না কেন? না আছে সিস্টেম্যাটিক ভবিষ্যৎ, না আছে সরকারী সাহায্য। মূলত মেলার স্টলের ওপর নির্ভর করে ওনাদের অর্থনীতি। কিন্তু সেখানেও সমস্যা। মেলায় স্টল পাওয়া গেলেও ভাড়া থাকে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। আর সেই ভাড়ার টাকাও যদি কোন মতে জোগাড় হয়, তাও স্টল পাওয়া যায় একেবারে ভিতরের দিকে।
একটা ধুঁকতে থাকা শিল্পকে ভালো না বাসলে এভাবে আঁকড়ে থাকা যায় না। প্রতিদিন এক এক করে পরিচর্যার অভাবে কত শিল্প শেষ হয়ে যাচ্ছে। না মরে বেঁচে আছেন গ্রাম-বাংলার শিল্পীরা। শিল্পীদের কথা ভেবে বিশ্ব-বাংলা নামে স্টল তো খোলা হয়েছে, কিন্তু সেই সুবিধা কতজন শিল্পীর কাছে পৌঁছয়? যদি পৌঁছয়, তাহলে শিল্পীদের মধ্যে শিল্প বাঁচিয়ে রাখার করুণ স্বর কেন? শুধু শিল্পটুকু বাঁচিয়ে রাখতে চাই। কানাইলাল বাবুর মত আরও শিল্পীদের শুধু এটুকুই দাবি। তাই সরকারকে আরও বেশি করে পাশে পাওয়ার ইচ্ছে চিরন্তন।
সুব্রত সরকার
বাঁকুড়া