Daily
কথায় বলে, বেল পাকলে কাকের কী? কিন্তু বাস্তবে কাকের চেয়েও পাকা বেলের কদর বেশি মনুষ্যসমাজে। মানে, পাকা বেলের চাহিদা সবসময় থাকে। তার কারণ, বেলের হাজারো গুণ রয়েছে। যা স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারি। আর রাজ্যে সবথেকে বড় বেলের হাট বসে আমডাঙা থানার কামদেবপুরের রঞ্জনগাছায়। সেখানেই পৌঁছে গেছিল বিজনেস প্রাইম নিউজের ক্যামেরা। অতি ভেষজগুণ সম্পন্ন বেল নিয়ে মানুষের মধ্যে ব্যস্ততা কেমন থাকে, তার খোঁজ করাই ছিল আসল উদ্দ্যেশ্য।
রাজ্যের সবচেয়ে বড় বেলের হাট বসে আমডাঙা থানার কামদেবপুরের রঞ্জনগাছায়। শুধু রঞ্জনগাছা নয়, কামদেবপুরের সোনাডাঙ্গা সহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা এখন মেতে আছে বেল নিয়ে। বেলের কাজ শুরু হয় কার্তিক মাসে। একইসঙ্গে শুরু হয় চরম ব্যস্ততা। এবং বেলের এই কাজ শেষ হয় চৈত্র বৈশাখ মাসে। বর্তমানে এখানে চারশো থেকে পাঁচশো ব্যবসায়ী রয়েছেন, যাদের জীবন-জীবিকার পুরোটাই নির্ভর করে বেলের উপর। গাছ থেকে বেল পাড়া, সেই বেল পাকানো, বেল ধোয়া, বেল গোছানো, লোডিং-আনলোডিং- শুধুমাত্র বেলকে ঘিরে কর্মকাণ্ড চলে ভীষণরকম। যার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে প্রায় আরও হাজার দুয়েক মানুষের পেট। তবে এই বেলের বাজার কিন্তু আজকের নয়। প্রায় একশো বছর বয়স হতে চলল এই বেল বাজারের। এই বিষয়ে কী বলছেন বেল ব্যবসায়ী ফিরোজ মণ্ডল, শুনে নেওয়া যাক।
আমডাঙ্গা থানার কামদেবপুর, রঞ্জনগাছায় কাঁচা বেল আসে বিহার, উড়িষ্যা, ঝাড়খন্ড সহ আশপাশ এলাকা থেকে। এখানে এসে এই বস্তায় ভরা বেল গোছানো, বাছাই করা হয়। এবং অভিনব কায়দায় গর্তে ভরে ঘুঁটে, কুড়োর ধোঁয়া এবং কার্বাইড সহযোগে পাকানো হয়। গাছ থেকে পাড়ার পর কিভাবে এই বেল বাজারজাত করা হয়, তার একটা সম্যক ধারণা বিজনেস প্রাইম নিউজকে দিলেন ফিরোজ মন্ডল।
চলতি সময়ে বেলের ওপর ভর করে জমজমাট কামদেবপুরের বিভিন্ন এলাকা। বিভিন্ন পড়শি গ্রাম থেকেও মানুষজন এখানে আসেন। জীবিকার টানে, পেটের টানে। তারপর সেই কাজ চলে চৈত্র-বৈশাখ পর্যন্ত। তাই, কঠিন সময়েও বেল বহু মানুষের উপার্জনের একটা শক্ত খুঁটি হিসেবে ধরা দিচ্ছে। ফলে বেলের কাজ করে যদি দৈনিক কিছু টাকাও চলে আসে, অসুবিধে তো নেই। এই মাগ্যিগণ্ডার বাজারে, তাই বেলের হাতেই রয়েছে মানুষের উপার্জন।
তবে এখানে শুধু পুরুষকর্মীরাই নন। বেলের কাজে হাত লাগিয়েছেন বহু মহিলা কর্মী। যারা এই কয়েকমাসে বেলের হাত ধরেই দৈনিক ২০০,২৫০ টাকা রোজগার করছেন। অন্যান্য সময়ে কাজের ধরন বদলালেও, এই কয়েক মাস তাঁরা শুধু বেল ব্যবসার ওপরেই জোর দেন। এর ফলে, তাঁদের যেমন কর্মসংস্থান তৈরি হয়, তেমনই বেল ব্যবসায়ীরাও যথেষ্ট লাভবান হন। কী বলছেন এখানকার মহিলা কর্মী দীপা মোড়ল, শুনে নেওয়া যাক।
বেলের কাজ বড় কাজ। এই কাজে তাই ‘না’ নেই। সারাবছর অন্যান্য কাজ করলেও এই কাজের জন্য কর্মী পাওয়া কিন্তু দুষ্কর হয় না। তাই একদিকে যখন নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি থেকে শুরু করে সব কিছুই একটা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। তখন অন্যদিকে সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে কর্মীরা কাজ করেন। তাই যত যাই হোক, এই সকল অস্থায়ী কর্মীদের কিন্তু কাজের অভাব থাকে না। বরং বছরভর তাঁরা কাজ করেন এবং উপার্জন করেন।
বেল অতি ভেষজ গুণ সম্পন্ন ফল। বেল গাছের প্রতিটি উপাদান মানবকল্যাণে কার্যকরী ভূমিকা নেয়। বেল অ্যান্টি অক্সিডেন্ট, বেল কোষ্ঠকাঠিন্য কমায়। কাঁচা এবং পাকা বেল ডায়রিয়া, ডায়াবেটিস, ব্লাড সুগার, যক্ষা, আর্থারাইটিস, স্কার্ভি, ব্লাড প্রেসার, আমাশার মত বিভিন্ন রোগের উপশম করে। বেল এনার্জি বাড়ায়। বেলের পাতা ভেজানো জল আলসারের উৎকৃষ্ট ওষুধ। তাহলে, বুঝতেই পারছেন বেলের কত গুণ। সুতরাং বেল পাকলে কাকের কিছু এসে না-গেলেও, বহু বহু মানুষের পেট কিন্তু জড়িয়ে থাকে এই বেল ঘিরেই। আর যে কারণেই রাজ্যের সবচেয়ে বড় বেলের হাট বসে আমডাঙা থানার কামদেবপুরের রঞ্জনগাছায়। ব্যস্ততার সঙ্গে ব্যবসাও থাকে ভালোরকম।
সুব্রত সরকার
আমডাঙা