Daily

বন্ধুরা আজ যে’কটি ডেভেলপড নেশনস রয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম কানাডা। ইউনাইটেড স্টেটস অফ আমেরিকার গা ঘেঁষা এই দেশটি সবদিক থেকেই অন্যান্য দেশের থেকে অনেকটা এগিয়ে। কিন্তু আজ সেই দেশের অর্থনীতির কপালে পড়েছে চিন্তার ভাঁজ। এবং ভুলেও ভাববেন না যে, ইকোনমিক ক্রাইসিস যা আজকের কানাডাকে বেকায়দায় ফেলতে পারে, সেটা সাময়িক। কারণ, কানাডায় যে ইকোনমিক ক্রাইসিস তৈরি হয়েছে সেটা ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। তার খেসারত ভালোরকম দিতে হতে পারে কানাডার সাধারণ মানুষকে। আর এই পুরো সিস্টেমকে কার্যত ধসিয়ে দিচ্ছে একটাই দেশ- সেটা আমেরিকা। কিভাবে এবং কেন সেটা নিয়েই আলোচনা সারব আজকের প্রতিবেদনে। আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করব, কানাডার ইকোনমিতে সমস্যাটা ঠিক কোথায়?
ল্যান্ড মাসের নিরিখে কানাডা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ। র্যাঙ্কিং-এ রয়েছে রাশিয়ার ঠিক পরেই। আমেরিকার সঙ্গে বর্ডার শেয়ার করেছে ৮৮৯১ কিলোমিটার মত। কানাডা-আমেরিকার বর্ডার বিশ্বের অন্যতম লম্বা বর্ডার। কিন্তু জানেন কি যে কানাডার অধিকাংশ মানুষ বসবাস করেন সাউদার্ন ইউএস-কানাডার বর্ডারে? এখানেই থাকেন প্রায় ৮০% মানুষ। দেশের মোট জিডিপির ৩৮ শতাংশ আসে অন্টারিও থেকে। কানাডার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ইন্ডাস্ট্রি যা কানাডার অর্থনীতির চাকা সচল রেখেছে, সেগুলো হল রিয়েল এস্টেট, মাইনিং এবং ম্যানুফ্যাকচারিং। যা কানাডার এই এরিয়াগুলোতেই অবস্থিত। খেয়াল করলে দেখবেন, ২০০৮ সালে যখন ইকোনমিক ক্রাইসিস তৈরি হয় তারপর থেকে কানাডা আর নিজের গ্রোথ সেভাবে তুলে ধরতে পারেনি। একদিকে অর্থনীতির গ্রোথ শ্লথ হয়েছে আর অন্যদিকে আবাসনের দাম বেনজির বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০০৯ সালে ইকোনমিক গ্রোথ কিছুটা ধরে রাখার জন্য কানাডার সরকার এবং সেন্ট্রাল ব্যাঙ্ক একটা পরিকল্পনা গ্রহণ করে। তারা ইন্টারেস্ট রেট নামিয়ে আনে ১ শতাংশে। কিন্তু সেটা দেওয়া হচ্ছিল একমাত্র বাড়ি কেনার সময়। সুযোগ কেউ হাতছাড়া করতে চাইল না। আর যে কারণে কানাডার সাধারণ মানুষ লোন নিয়েই ঘর, বাড়ি কিনতে শুরু করে। কিন্তু ইন্টারেস্ট রেট বৃদ্ধি পেতেই সেখানে সমস্যা দানা বাঁধে। কানাডার ৬৩ শতাংশ মানুষের মনে এই ধারণা তৈরি হয়েছে যে তাঁরা আর কোনদিন হয়ত ঘর, বাড়ি তৈরি করতে বা কিনতে পারবেন না। কানাডায় সব দেশ থেকেই ইমিগ্রেন্টসরা আসেন। ফলে থাকার জায়গা একটা বড় বিষয় হয়ে দাঁড়ায় কানাডায়। কিন্তু এখন যা অবস্থা! ঘর, বাড়ির দাম বাড়ছে। এদিকে মানুষের খরচ করার সামর্থ্য প্রতিদিন কমছে। এছাড়াও রয়েছে আরেকটা সমস্যা।
কানাডার অধিকাংশ মানুষ এখনো বিনিয়োগ করতে কোন বিজনেস বা অন্য সেক্টরের ওপর ভরসা না-করে, বরং তাঁরা রিয়েল এস্টেটের ওপর নির্ভর করেন। সেটা খুব চ্যালেঞ্জিং একটা বিষয়। রিয়েল এস্টেট কানাডার ইকোনমির জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ ঠিকই। কিন্তু রিয়েল এস্টেট কখনই বিনিয়োগ করার জন্য খুব রিলায়েবল কোন প্ল্যাটফর্ম হতে পারেনা। কারণ রিয়েল এস্টেট এমন কোন ভবিষ্যৎ তৈরি করে না যে ইকোনমিক গ্রোথে দুর্দান্ত কোন হেল্প করতে পারে। কারণ এই সেক্টর থেকে কোন পণ্য এক্সপোর্ট করা যায় না। সুতরাং আভ্যন্তরীণ সিচুয়েশন ভালো না থাকলে রিয়েল এস্টেট সেক্টরে বিনিয়োগ করাটা বেশ আতঙ্কের। ইনভেস্টরসদের টাকা জলাঞ্জলি যেতে পারে। এমনকি এই সেক্টর সেভাবে কোন কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে না। যদি আমেরিকার দিকে তাকাই, তাহলে দেখব কানাডার সরকার মার্কিনী প্রশাসনের তুলনায় বিজনেস সেক্টরে অনেক কম বিনিয়োগ করে। আর যে কারণে পৃথিবীর প্রথম একশোটি বড় কোম্পানির মধ্যে একটিও কানাডার নয়। এই দেশে যত ছোট ছোট বিজনেস এবং স্টার্ট আপ রয়েছে, তাদের বেড়ে ওঠার জন্য প্রয়োজন ফরেন ডিরেক্ট ইনভেস্টমেন্টের। আর কানাডায় এফডিআই-এর অধিকাংশটাই আসে মার্কিন মুলুক থেকে। এর ফলে কী হল? কানাডা এবং আমেরিকার মধ্যে রিলেশন যেহেতু দাদা-ভাইয়ের মতন, তাই দুই দেশের মানুষের যাওয়া আসার মধ্যে কোন রেস্ট্রিকশন নেই। ফলে কানাডার অনেক মানুষই আজ পারি জমাচ্ছেন আমেরিকায়। আমেরিকার কিছু বড় বড় সংস্থা তাদের হেড কোয়ার্টার আমেরিকায় রাখলেও যাবতীয় কাজ করছে কানাডা থেকে। সেই দেশের নিজস্ব কিছু পলিসি রয়েছে। আর সেই পলিসি মোতাবেক এগোলে দেখা যাবে, কানাডায় আমেরিকার বহু প্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে নিজের মনোপলি বিজনেস সেট আপ তৈরি করে ফেলছে। কানাডা সরকারের পলিসি হচ্ছে, যদি কোন স্টার্ট-আপ সংস্থা নিজের আইপিও ছাড়তে চায়, তাহলে কানাডার সরকার সেই কোম্পানিকে ভালোরকম ট্যাক্স বেনিফিট দিতে পারে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, আমেরিকার প্রতিষ্ঠানগুলো কানাডার এই সকল স্টার্ট-আপ সংস্থাকে কার্যত গিলে খেয়ে নেয়। সেই প্রভাব পড়ে কানাডার সাধারণ মানুষের বছরভর আয়ের ওপরেও। যেখানে একজন সাধারণ কানাডিয়ান বছরে ৬০ হাজার ডলার আয় করেন, সেখানে একজন আমেরিকান আয় করেন ৮০ হাজার ডলার। একইসঙ্গে যেখানে একজন আমেরিকান ঘণ্টায় ৭৪ ডলারের ভ্যালু তৈরি করতে পারে, সেখানে একজন কানাডিয়ান কন্ট্রিবিউট করে মাত্র ৫৭ ডলার মতন। আরেকটা বিষয় হচ্ছে যে আমেরিকার প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে ভালো মেশিন, উন্নত প্রযুক্তিব্যবস্থা সবই রয়েছে। সঙ্গে রয়েছে ভালো ক্যাপিটাল। ফলে আমেরিকার একটা ফার্ম যেখানে নিজের কর্মীদের জন্য ২০.৫ হাজার ডলার খরচ করে সেখানে কানাডার ফার্ম খরচ করে ১৩ হাজার ডলারের আশেপাশে।
আমরা সকলেই জানি যে, জি-৭ তৈরি হয়েছে বিশ্বের প্রথম সারির সাতটি দেশ নিয়ে। যার মধ্যে রয়েছে কানাডা। কিন্তু এটা জানেন যে, কানাডা জি-৭ এর একমাত্র দেশ, যে আরঅ্যান্ডডি-র জন্য সবথেকে কম বিনিয়োগ করে। আর আমেরিকা! কানাডার থেকে দ্বিগুণ গতিতে রিসার্চ এবং ইনোভেশন প্রসেস তারা চালিয়ে যাচ্ছে। কানাডা এবং আমেরিকার ইকোনমিক সিস্টেমে একটি ফারাক তো রয়েছেই। আমেরিকায় যেখানে চলে ক্যাপিটালিস্টিক সিস্টেম, সেখানে কানাডায় চলে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট সিস্টেম। যে কারণে কানাডা কোনদিনই ইলন মাস্ক বা জেফ বেজোসের মত ধনকুবের দিতে পারবে না। কিন্তু এটাও তো ঠিক যে, কানাডার এই স্ট্রাকচারের কারণে আজ সেই দেশের সাধারণ মানুষ মোটামুটি উপার্জন করেও দিনের শেষে অনেকটা ভালো থাকতে পারে আমেরিকার থেকে। কানাডায় হসপিটাল খরচা ফ্রি বা বেশ কম। এডুকেশন সিস্টেম যথেষ্ট ভালো। আর সাধারণ মানুষের জন্য করার তাগিদ রয়েছে কানাডার সরকারের। কিন্তু কানাডা কি এভাবে নিজের মডেল ধরে রাখতে পারবে? নাকি আমেরিকার এই স্মাইলিং আগ্রাসী মনোভাবের কারণে অন্ধকারে চলে যাবে কানাডার ইকোনমি? প্রশ্নটা রাখলাম আপনাদের কাছে। মতামতের জন্য তো কমেন্ট বক্স রয়েছেই।
বিজনেস প্রাইম নিউজ।
জীবন হোক অর্থবহ