Story
কেক ছাড়া ক্রিস্টমাস? নৈব নৈব চ! সে আপনি মিষ্টি প্রেমী হন বা না হন, ক্রিস্টমাসের নাম শুনলে মনটা কি কেকের জন্য হু হু করে উঠবে না? আর কোলকাতায় ক্রিস্টমাস মানেই- নিউ মার্কেট চলো। ভিনটেজ কোলকাতার ইহুদি বেকারি বলুন কি আজকের নিউমার্কেটে গলিঘুঁজির ফাকে গজিয়ে ওঠে নাম না জানা বেকারি, ডিসেম্বরের কনকনে শীতেও গলগল করে ঘেমে বড়দিনের কেক কেনার যে একটা উত্তেজনা, সেটা কিন্তু আজও এতটুকু ফিকে হয়নি। ভিড় ঠেলে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে সান্টাক্লজের ছবি আঁকা টিনের বাক্সটা না নিলে বুঝি বড়দিন বড়দিন ভাইবটা ঠিক আসে না। সময় বদলেছে। অতিমারির পর শহরবাসীর স্বভাবেও এসেছে বদল। এখন স্মার্টফোনে দুটো টোকা মারলেই বাড়ির সামনে হাজির হয়ে যায় মোটরবাইক। সাহেবি মোড়কে বাক্সবন্দী হয়ে আসে বড়দিনের কেক। তা বলে কী ধর্মতলার কেকের ব্যবসা লাটে উঠবে? কখনও না। আজও কোলকাতাবাসীর কাছে ক্রিস্টমাস মানেই ধর্মতলার বেকারি। কিন্তু ক্রিস্টমাসের সঙ্গে এই কেকের যে একটা ইমোশনাল অ্যাটাচমেন্ট আছে, সেটা কীভাবে সম্ভব হল? বড়দিনে কেক কালচার, কবেকার?
হাতের কাছে যদি একটা টাইম মেশিন থাকত, তবে কত কিছুর উৎস খুঁজে ফেলা যেত, তাই না। সে যাই হোক। যেটা নেই, সেটা নিয়ে দুঃখ পাবার কিছু নেই। আপাতত আমাদের হাতের কাছে আছে ‘দ্য অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারি’। যেখানে রয়েছে কেকের ইতিহাস। অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারি বলছে, কেকের ইতিহাস জানতে আমাদের চলে যেতে হবে ১৩-এর দশকে। প্রাচীন স্ক্যান্ডেনেভিয়ান শব্দ ‘কাকা’ থেকে এসেছে কেক। তবে আজকের কেকের সঙ্গে এর বিস্তর ফারাক। তখন কেক বলতে ছিল পাউরুটি। স্বাদ মিষ্টি করতে মধু ব্যবহার করা হত। রুটি তৈরির মতো আটা বা ময়দায় ময়াম দিয়ে বেলন দিয়ে বেলে প্যান কিংবা তাওয়ায় বসানো হতো। তারপর গোল তাওয়ায় সেঁকে নেওয়া হতো কেক। বলে রাখা ভালো, এই কারণেই কিন্তু আজও বেশিরভাগ কেকের শেপ গোলই হয়। বাদাম, কিশমিশ, সিট্রনের মতো ড্রাই ফ্রুট দিয়ে সেগুলোকে গার্নিশ করা হত। মধ্যযুগে ইউরোপের বেকারিগুলোতে মাঝে মাঝে এই ধরণের কেক বানানো হত। তবে, কি জানেন তো, এই কেক কিন্তু কয়েকমাস অবধি দিব্যি রেখে দেওয়া যেত। এতটুকু পচন ধরত না।
কাট টু ১৭ শতকের মাঝামাঝি, ইউরোপ। যাত্রা শুরু হয় আজকের কেকের। তখন কাঠের গুঁড়ো বা মেটাল ট্রেতে কেক বেক করা হতো। তারপর কেক প্যানে সেগুলোকে নামিয়ে নিয়ে আইসিং করা হত। ফারমেন্টেশনের জন্য ব্যবহার করা হত ইস্ট। এরপর ১৮৪০ নাগাদ বেকিং পাউডারের আবিষ্কার কেক ইন্ডাস্ট্রিতে একটা গুরুত্বপূর্ণ ছাপ রাখে। ইস্টের বদলে কেকের ফারমেন্টেশন শুরু হয় বেকিং পাউডার দিয়েই। তবে আজকের কেকের যে স্বাদ, যে নমনীয়তা, সেটা আসতে সময় লাগে বেশ খানিকটা। বিশ শতকের প্রথম কয়েক দশক পর্যন্ত কেকে বয়েলড আইসিংয়ের বদলে বাটার ক্রিম ফ্রস্টিং ব্যবহার করতেন ইউরোপীয় শেফরা। সেই ফ্রস্টিং তৈরি করা হত বাটার, ক্রিম, চিনির মিহি গুঁড়ো এবং রঙিন ফুড ফ্লেভার দিয়ে। ধীরে ধীরে কেকের অভিযোজন হতে থাকে।
শুরুতেই বলেছিলাম, কেকের সঙ্গে বড়দিনের সম্পর্ক বড় গভীর। একটা ইমোশনাল অ্যাটাচমেন্ট রয়েছে। এবার খুঁজবো সেই উৎস। ইতিহাস বলছে, ৩৩৬ সালে রোমান সম্রাট কন্সটেন্টাইনের আমলে প্রথম বড়দিন পালন করা হয়। তখন কেক ছিল না। ছিল প্লাম পরিজ। নিয়ম ছিল, ক্রিস্টমাসের আগের দিন উপোস করা হবে। আর ক্রিস্টমাসের দিন দীর্ঘ সেই উপোস ভাঙবে প্লাম পরিজ খেয়ে। ইংরেজরা সেই নিয়মই মানতেন। সেই রীতি চলে পরবর্তী বেশ কিছু কাল ধরে। বড়দিনে কেক খাওয়ার রীতি শুরু হয় অবশ্য তার অনেক পরে, ইংরেজদের হাত ধরেই। ১৬ শতক নাগাদ ক্রিস্টমাস কেক তৈরি হতো আটা, ময়দা আর ডিমের সংমিশ্রণে। আর এই উপকরণগুলো যোগ হওয়ায় প্লাম কেক তৈরি হওয়া অনেক সহজ হয়ে যায়। যে সব পরিবারে ওভেন ছিল, তাঁরা ইস্টারের জন্য মারজিপ্যান বা আমন্ড সুগার পেস্ট ব্যবহার করে ফ্রুট কেক তৈরি করতেন । আর বড়দিনের আগে শুকনো ফল ও মশলা ব্যবহার করে কেক তৈরি করতেন। এই কেকগুলিই কালক্রমে ক্রিস্টমাস কেক নামে জনপ্রিয় হয়।
তবে এখন এক এক দেশের আবার এক এক রকম কেক বানানোর বা গারনিশ করার চল। যেমন ধরুন, যে ইংরেজদের হাত ধরে জনপ্রিয় হল ক্রিস্টমাস কেক, তারা কিন্তু কেক গারনিশিং-এর জন্য রামে ভেজানো কিশমিশ বা কারেন্টস রাখে। আবার স্কটিশে জনপ্রিয় হুইস্কি ডান্ডি। জার্মানিরা ক্রিস্টমাস পালন করেন স্টলেন নামক ফ্রুট কেক খেয়ে। আবার ফ্রান্স কিংবা লেবাননে নো ফ্রুট কেক ‘বুশ ডি নোয়েলের’ একটা আলাদা ক্রেজ রয়েছে এই ক্রিস্টমাসের সময়। তবে, কবির কথায় জোর আছে! ওই যে বলে গিয়েছিলেন, গোলাপকে যে নামেই ডাকা হোক না কেন, গোলাপ গোলাপই থাকে। তাই বাহারি দুনিয়ায় বাহারি মোড়কে সেজে কেকের যত সহস্রকোটি নামকরণ করা হোক না কেন, কেক কেকই থাকবে। কোলকাতার শীত উৎসবের আগে দিয়ে ধর্মতলার বেকারিগুলোয় ভিড় অন্তত সেই প্রতিশ্রুতি দেয়। কোলকাতায় শীত আসে, উৎসব আসে- দিনকয়েকের উচ্ছাস ফের মলিন হতে থাকে কর্মব্যস্ততায়। কেবল এক থেকে যায় বড়দিন নিয়ে কেকের প্রতি চিরপরিচিত সেই আবেগ। অনলাইন বা অফলাইনে সেই কেকপ্রেমীদের হিড়িক বারবার প্রমাণ করে, শহরে শীতের উৎসব ফিকে হয় না, ফিকে হবার নয়।
বিজনেস প্রাইম নিউজ।
জীবন হোক অর্থবহ।