Story
একে, রসগোল্লা। দুয়ে, রবীন্দ্রনাথ। বাংলাকে গোটা দুনিয়া চেনে দুটো লেটারে। এই লেটারটির নাম ‘আর’ এবং মুর্শিদাবাদকে গোটা ভারতবর্ষ চেনে ইংরেজির দুটি হরফে। একটি এন অন্যটি সি দিয়ে। এন ফর নবাবস। আর সি ফর ছানাবড়া। এই ছানাবড়াতেই মিশে রয়েছে মুর্শিদাবাদের আর্থিক প্রগতি আর অতীত ঐতিহ্যের লম্বা লিগ্যাসি।
ভারতে এমন লোক খুঁজে পাওয়া যাবে না যিনি মুর্শিদাবাদের নাম শোনেননি। ভারত বলতেই ইংরেজ আর পলাশীর যুদ্ধ। এর সঙ্গেই ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে মুর্শিদাবাদের নাম। তাই নবাবের দেশ মুর্শিদাবাদের অন্য পরিচয় হলো ছানাবড়ার জন্মভূমি।
বাংলায় নবাবি আমলের শেষের দিক থেকে ছানাবড়া উত্থান হয়। এই ছানাবড়া জগৎজোড়া খ্যাতি অর্জন করে কাশিমবাজারের মহারাজা মনীন্দ্র চন্দ্র নন্দীর হাত ধরে। বিশেষ করে লালবাগের হাজার দুয়ার প্যালেসে নবাবদের আতিথেয়তার অন্যতম শোপিস হয়ে ওঠে এই ছানাবড়া। অন্যদিকে, কাশিমবাজারের মহারাজা মণীন্দ্রচন্দ্র নন্দীর হাত ধরে এই ছানাবড়া ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে খ্যাতি অর্জনের পাশাপাশি ব্রিটেনের রাজদরবারেও ঢোকার অনুমতি পায়।
মুর্শিদাবাদের ছানাবড়া সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু বিখ্যাত মনীষীদের নাম। কথিত আছে, শ্রীরামকৃষ্ণের তিরোধানের পর একবার স্বামী অখন্ডানন্দ বহরমপুরে কোন কাজে এসেছিলেন। ফেরার সময় তিনি বেলুড়মঠে নরেনের জন্য সোয়া সেরের দুটি ছানাবড়া নিয়ে যান। আবার ১৯৩৮ সালে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে ছানাবড়া উপহার দিয়েছিলেন এখানকার তৎকালীন স্বাধীনতা সংগ্রামীরা।
ইনি পিন্টু দাস। বহরমপুরের বিখ্যাত মিষ্টান্ন বিক্রেতা। এখনো বিক্রির বেশিরভাগ অংশটাই জুড়ে রয়েছে ছানাবড়া। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী থেকে শুরু করে প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়। রাহুল গান্ধী থেকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। এমনকি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পর্যন্ত সবাইকে ছানাবড়া খাওয়ানোর অভিজ্ঞতা রয়েছে এই বিক্রেতার ঝুলিতে। রাজনৈতিক নেতারা তো উনার দোকানে বসে খেয়েছেন এখানকার ছানাবড়া। সেই ছবিও জ্বলজ্বল করছে আজও দোকানে।
ক্রেতা থেকে বিক্রেতা। শহরের বিভিন্ন দোকানে একটা কমন আইটেম হলো এই ছানাবড়া। ক্রেতা থেকে বিক্রেতা সবার সেন্টিমেন্ট জড়িয়ে এই ঐতিহাসিক মিষ্টিতে। নিছক বেড়াতে কিংবা আত্মীয়র বাড়িতে আসলে ছানাবড়া খেতেই হবে।
ইনি শিবশঙ্কর চক্রবর্তী। থাকেন যাদবপুরে। শ্বশুরবাড়ি বহরমপুর হওয়ার সুবাদে মাঝেমধ্যেই এখানে এসে দেখে যান এই ঐতিহাসিক মিষ্টির স্বাদ।
মুর্শিদাবাদের মিষ্টান্ন ব্যবসায়ীদের বেশিরভাগ অংশই মনে করেন এখনও জেলার বেশিরভাগ মিষ্টির দোকানে বিক্রির নিরিখে সবার আগে রয়েছে ছানাবড়া। তবে এখন কিছু কিছু ফিউশন মিষ্টি আসলেও ছানাবড়া কিন্তু এখনো কোন অংশে তার থেকে কম যায় না। কারণ তো অবশ্যই ইতিহাস।
বাড়িতে লোকজন কিংবা বড় উৎসবে এখানকার মানুষজন এখনো টার্গেট করেন ছানাবড়াকেই। ছানাবড়া ছাড়া মুর্শিদাবাদে কি স্বাধীনতার উৎসব সাজে? আর যাই হোক উৎসব পর্বে চাই চাই এই মিষ্টি। এমনটাই মত স্থানীয় বাসিন্দাদের।
ইমি দেবব্রত মারিক। তৃণমূল নেতা। স্থানীয় বাসিন্দা। শুনুন কি বলছে এই মিষ্টি নিয়ে।
বহরমপুর পৌরসভা ছানাবড়াকে বিশ্ববন্দিত করতে, এখানকার মিষ্টান্ন অর্থনীতিকে আরো মজবুত করতে ইতিমধ্যেই জোর কদমে আলোচনা শুরু করে দিয়েছেন ব্যবসায়ীদের সঙ্গে। যাতে সরকারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ছানাবড়াকে বিশ্বের দরবারে আরো একবার তুলে ধরা যায়।
ইনি জয়ন্ত প্রামাণিক। বহরমপুর পৌরসভার পৌর প্রশাসক। ছানাবড়া বলতেই নষ্টালজিক হয়ে পড়ে বললেন।
মুর্শিদাবাদ জেলার অলিগলি পেরিয়ে এই ছানাবড়া ইতিমধ্যেই পা রেখেছে দুবাই ব্রাজিল, ইতালি সহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। মিষ্টি ব্যবসায়ীদের বক্তব্য অনুযায়ী, কোনরকম রাসায়নিক ছাড়াই এই মিষ্টি দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায়। তাই এই মিষ্টির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে রপ্তানির অনন্ত সুযোগের সম্ভাবনা।
রসগোল্লা যদি পেটেন্ট পেতে পারে। ছানাবড়া তবে তো রয়েছে মহা পেটেন্টের অপেক্ষায়। কয়েকশো বছরের ইতিহাস আর অতুলনীয় স্বাদ সঙ্গে বিদেশে রপ্তানির সম্ভাবনা। সব মিলিয়ে আজ মুর্শিদাবাদ জেলায় মিষ্টান্ন অর্থনীতিতে সিংহভাগ জুড়ে রয়েছে এই ঐতিহাসিক ছানাবড়া।
কুশল শরিফ, মুর্শিদাবাদ