Daily
‘এই কালি কলঙ্কের চেয়েও কালো’- বিজ্ঞাপনের ভাষা এর চেয়েও সংক্ষিপ্ত, আকর্ষণীয় বা বুদ্ধিদীপ্ত আর কী বা হতে পারে? রবীন্দ্রনাথই প্রথম বাংলায় বিজ্ঞাপনের ভাষা তৈরি করেছিলেন। আর ভাষা কতটা সংক্ষিপ্ত আর অর্থবহ হতে পারে, তাও তিনিই শিখিয়েছিলেন। আজও সেই ধারা অব্যাহত আছে। শুধু নেই সেই কালি। দেশ তখনও স্বাধীন হয়নি। দেশের সেই উত্তাল পরিস্থিতিতে মহাত্মা গান্ধীর অনুপ্রেরণায় ১৯৩৪ সালে স্বাধীনতা সংগ্রামী ননীগোপাল মৈত্র তাঁর ভাই শঙ্করাচার্য মৈত্রের সঙ্গে স্বদেশী কালি তৈরির উদ্যোগ নেন। বিদেশী জিনিস বর্জন করে স্বদেশী জিনিস ব্যবহারে জোর দেওয়ার আন্দোলন চলছে জোরকদমে। শুরু হয় সুলেখা কালির যাত্রা। স্বদেশী আমলে বিদেশী পণ্য বর্জনের স্পর্ধা দেখিয়েছিল সুলেখা। পরবর্তীতে মেক ইন ইন্ডিয়ার আদর্শ প্রতিষ্ঠা করেছিল সুলেখা ফ্যাক্টরি। বাংলা তো বটেই, একটা সময় দেশজুড়ে সুলেখা কালির একচেটিয়া ব্যবসা শুরু হয়ে যায়। সে সময় এই কালির চাহিদা এতটাই বাড়ে যে বাংলার বাইরেও সুলেখা কালির উৎপাদন শুরু হয়। দীর্ঘদিন পর আবার নতুন করে আলচনায় এই লেখার তরল।
ফাউন্টেন পেন আর কালির দোয়াত বাঙালির কাছে আজও নস্টালজিয়া। তাই ৪৬ তম বইমেলায়, প্রথমবারের মতো সুলেখার স্টল দেখে স্মৃতিমেদুর হয়ে পড়ে বইপ্রেমী বাঙালি। গেট নম্বর ৬ দিয়ে ঢুকলেই খুঁজে পাওয়া যাবে স্টল নম্বর ২৫৩। সুলেখার স্টলে ঢুঁ মেরেছিল বিজনেস প্রাইম নিউজ। সুলেখা মানেই নস্টালজিয়া। আর সেই নস্টালজিয়াতে ভাসতে বাঙালি যে ভালবাসবে, সেকথা বলার অপেক্ষা রাখে না। সুলেখা নিয়ে বাঙালির আবেগ যে একইরকম রয়েছে, সেটা এই স্টলে আসলেই বোঝা যাবে ভালো মতন। বিক্রিও মন্দ হচ্ছে না। অন্যদিকে পূর্ণ ভাঁড়ার নিয়েও সুলেখাও একেবারে তৈরি। রয়েছে লাল, কালো, বাদামি, সবুজ প্রভৃতি নানা রঙের কালির সম্ভার। আর এই প্রত্যেকটি কালির সঙ্গে জুড়ে রয়েছে অবিভক্ত বাংলার ইতিহাস। বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার লড়াইতে শেষ হয়ে গিয়েছিল ২৬ টা তরতাজা প্রাণ, যাদের কুর্নিশ জানাতেই প্রতি বছর ভাষা দিবস পালন করা হয়। সেই ইতিহাসের কথা মাথায় রেখে সুলেখা তৈরি করেছে সেলাম- রক্তের মতই যার রং লাল। আবার বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি উপলখ্যে তৈরি করেছে গর্বের পঞ্চাশ, মানে সবুজ রঙের কালি। দেশবাসীর খিদের জ্বালা যে কবি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছিলেন, তাঁকে স্মরন করে নিয়ে এসেছে ‘সুকান্ত’- বাদামি রঙের কালি। এছাড়াও মাদার টেরেজাকে সম্মান জানাতে তৈরি করেছে নীল রঙের কালি, নাম মা।
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস সাক্ষী আছে, এই সুলেখার আঁচরে সৃষ্টি হয়েছে কত কত কালজয়ী সাহিত্য। কিন্তু হঠাৎই বাজারে আসা বলপেনের দৌড়ে থমকে গিয়েছিল সুলেখা কালির পথ চলা। ১৯৮৮ নাগাদ বন্ধ হয়ে যায় সুলেখা কালির কারখানা। দীর্ঘ ১৮ বছর বন্ধ থাকার পর ফের সচল হয় সুলেখার কারখানার যন্ত্রপাতি। ঐতিহ্যে ভর করে শুরু হয় অস্তিত্ব বাঁচানোর লড়াই। আর এত ঝড় ঝাপটা সামলেও বাঙালির মধ্যে সেই একইরকম আবেগ ধরে রেখেছে সুলেখা, যার প্রমাণ খোদ বইমেলা চত্বরের স্টল নম্বর ২৫৩।
নতুন প্রজন্মের কাছে কালির কলম অনেকটা অবাক জলপানের মত। কিন্তু পঞ্চাশ কিংবা ষাটোর্ধ মানুষের কাছে আজও কালির কলম বা নিপ পেন ফিরিয়ে দেয় অনেক ছেলেবেলার পুরনো স্মৃতি ও ইতিহাসের কথা। সহজলভ্যতা এবং বিভিন্ন ব্যবসায়িক সুবিধার জন্য বলপেনের বাজারে কিছুটা ম্লান হয়ে পরে এই ফাউন্টেন পেনের বাজার। তবে, প্রথম বার বইমেলার স্টলে সুলখার স্টলে বাঙালিকে ভাসতে দেখে আপ্লুত সংস্থার প্রত্যেকে। আর এত ঝড়, বাধা বিপত্তি সামলেও যে ঘুরে দাঁড়িয়েছে সংস্থা, তা আর বলারব অপেক্ষা রাখে না।
বিক্রম লাহা
কোলকাতা