Daily
বরাবরই উৎসবের সঙ্গে খাবারের একটা ঘনিষ্ট সম্পর্ক থাকে। আর বিবিধ অন্নব্যঞ্জনই বকলমে দেবতা হয়ে উঠেছেন। এমন উৎসব তেরো পার্বণের দেশেও খুব বেশি নেই। আর উৎসব মানেই আনন্দে গা ভাসানো। গ্রামবাংলার বেশিরভাগ অনুষ্ঠানই কৃষিজ ফসলকে কেন্দ্র করে হয়ে থাকে। আপনারা নিশ্চয়ই নবান্ন উৎসবের নাম শুনেছেন। বা আম উৎসবের নাম শুনেছেন। উৎসবের বারোমাস্যায় এমনই এক ব্যতিক্রমী উতসব-অন্ন উৎসব। স্বাদুগন্ধে ম ম করা এমন বসন্ত দিন বড় একটা আসে না। তাই অন্ন উৎসবের মতো এমন উৎসব ভূ-ভারতে নজিরবিহীন।
লক্ষ্য, গ্রাম বাংলার হারিয়ে যাওয়া ফোক রাইস বা লৌকিক ধানগুলোকে পুনরায় ফিরিয়ে আনা। কারণ এরা একদিকে যেমন অতিপুষ্টিগুণসম্পন্ন তেমনই অন্যদিকে খরা, বন্যা, নোনা সহনশীল। এই প্রজাতির ধান চাষে খরচ কম, মাটির স্বাস্থ্য ভালো থাকে আর সর্বোপরি সম্ভাবনাও প্রচুর। আর সেই সমুহ সম্ভাবনার মেসেজ সকলের সামনে তুলে ধরতেই সম্প্রতি অন্ন উৎসবের আয়োজন করে নদিয়া জেলার হাঁসখালি ব্লকের গোপালনগর ফার্মার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন। এদিনের এই অন্ন উৎসবে ৩৬ রকম প্রজাতির লৌকিক ধান প্রদর্শিত হয়। তবে, শুধু প্রদর্শনী নয় মেলার কৃষি প্রশিক্ষণেরও ব্যবস্থা করেন আয়োজকরা।
একটা সময় ছিল, যখন প্রায় ১০ হাজার প্রজাতির ধান চাষ হতো এই বাংলায়। কিন্তু উন্নত কৃষিপদ্ধতির অভাবে আজ তার ৯৯ শতাংশ চালই হারিয়ে গিয়েছে। তবে, সবটা তো হারিয়ে ফেলতে দেওয়া যায় না। তাই কৃষিবিজ্ঞানীরা তাদের দীর্ঘ ১৭ বছরের চেষ্টায় বাঁচিয়ে রেখেছেন বাংলার বিলুপ্তপ্রায় প্রায় ৪০০ প্রজাতির ধান। যার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ব্ল্যাক রাইস বা কালো ধান। এই ধরণের উৎসব আগামীদিনে ধান চাষের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ হবে? সে বিষয়ে আমাদের জানালেন ফুলিয়া এগ্রিকালচার ট্রেনিং সেন্টারের এডিএ ডঃ অনুপম পাল।
উচ্চ ফলনশীল ধানের প্রভাবে এবং উন্নত কৃষি পদ্ধতির অভাবে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছিল গ্রাম বাংলার সুগন্ধি ধান। আগ্রহ কমছিল চাষিভাইদের মধ্যে। আর এই সুগন্ধি ধান সংরক্ষন করা নিয়ে ২০০৯ সাল থেকেই অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছেন বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শস্য বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ডঃ মৃত্যুঞ্জয় ঘোষ। মূলত যার প্রচেষ্টাতেই জিআই স্বীকৃতি পেয়েছে বাংলার গোবিন্দ ভোগ চাল। এই ধরণের অন্ন উৎসব আয়োজনের ফলে চাষিভাইদের মধ্যে যে এই চাল সম্বন্ধে আগ্রহ বাড়ছে, তা জানালেন মৃত্যুঞ্জয় বাবু।
ইলিশ উৎসব, আম উৎসবের মতো এই ধরণের ব্যতিক্রমী উৎসবও যে সকল কৃষকবন্ধুদের মধ্যে বেশ ভালো সাড়া ফেলবে এবং আগামীদিনে দেশীয় ধানের চাষ-আবাদ বাড়বে, সে বিষয়ে আশাবাদী উৎসবের অন্যতম উদ্যোক্তা নিমাই বাবু।
সবমিলিয়ে এক জমজমাট ব্যতিক্রমী উৎসবের সাক্ষী থাকলো নদীয়া জেলা। ভবিষ্যতে সরকারী সহায়তা পেলে হয়তো আরও বাংলার প্রতিটি কোণায় কোণায় পৌঁছে যাবে এই ধরণের উৎসবের আলো। চাষিরা আগ্রহী হবেন হারিয়ে যাওয়া এই চালের বিষয়ে জানতে।
সুব্রত সরকার
নদীয়া