Story

সময়ের সঙ্গে সামনে আসে কত অজানা গল্পগাথা। ইতিহাসের পুরনো পাতা থেকে উঠে আসা কিছু কাহিনী যেমন সাধারণের চেতনায় চিরকালীন ছাপ ফেলে যায়। তেমনি বহু ইতিহাস উপেক্ষায় হারিয়ে যায় কালের গর্ভে। সময়ের হাওয়া খেয়ে খেয়ে একসময় সেই ইতিহাস জরাজীর্ণ হয়ে পড়ে। একটা গোটা অধ্যায় থেকে যায় সাধারণ মানুষের কাছে আলোচনার একেবারে বাইরে।
পুরুলিয়া। একটা সময় লাল মাটির এই জেলা ছিল নৃত্য এবং নাট্যের লোকভূমি। সংস্কৃতির বিচরন ক্ষেত্র। বিভিন্ন রাজপরিবারের রাজত্বকালে সেই এলাকার সমাজ, সংস্কৃতি, শিল্প-স্থাপত্য, পুরাকীর্তিতে সমৃদ্ধ হয়েছে এই জেলা। তারই নিদর্শন স্বরূপ পুরুলিয়ার বুকে এখনো দাঁড়িয়ে রয়েছে নাটমন্দিরটি। এই স্থাপত্যের ভেতরে প্রবেশ করলেই যেন এক ধাক্কায় পৌঁছে যাওয়া যায় ইতিহাসের সেই অনালোচিত অধ্যায়ে। আনুমানিক ষোড়শ শতকের শেষ ভাগে উজ্জ্বয়িনীর থেকে আসা জয় সিংহের হাত ধরে রাজত্বের সূচনা হয় পুরুলিয়াতে। রাজা জয় সিংহের নাম অনুসারে এলাকার নামকরণ হয় জয়পুর। ১১৩টি মৌজা নিয়ে এই জয়পুর এস্টেট তৈরী হয়েছিল। সেই জয় সিংহের সপ্তম পুরুষ কাশীনাথ সিংহ সিপাহী বিদ্রোহের উত্তরকালে ১৮৬০-১৮৭০ এই সময়কালের মধ্যে সম্পূর্ণ স্থানীয় পাথর দিয়ে একটি নাটমন্দিরের নির্মাণ শুরু করেন। এর এক একটি পাথরের উপর বিভিন্ন দেব -দেবীর মূর্তি, নকশা ফুটিয়ে তুলে প্রাকৃতিক উপকরণ দিয়ে তৈরী আঠা দিয়ে এক একটি পাথর জুড়ে নাটমন্দিরের কাঠামো তৈরী করা হয়। তৎকালীন সময়ে রাজপুতানা, মধ্যপ্রদেশ ও উত্তরপ্রদেশের সীমানা অঞ্চলের শিল্পশৈলীকে আধার করে এই নাটমন্দির নির্মাণ করা হয়েছিল। পুরুলিয়ার ছটকা ডুঙরি থেকে পাথর কেটে গরুর গাড়ি করে আনা হতো। তারপর, কেটে আনা পাথরগুলি প্রাণ পেত উজ্জ্বয়নী থেকে আসা শিল্পীদের হাতে। কিন্তু এই নাট মন্দির তৈরির ইতিহাস একেবারে অন্য।
সেই সময় খাদ্য সংকটকে এভাবেই আটকে দিয়েছিলেন রাজা কাশীনাথ সিং। কাজের পরিবর্তে রাজা ধান তুলে দিতেন শ্রমিকদের হাতে। রাজার কাজের বিনিময়ে খাদ্যের মত একটি মহৎ প্রকল্প সেই সময় বহু প্রজার জীবন, সংসার সবই বাঁচিয়েছিল। কিন্তু নাটমন্দির নির্মাণকালের সময়ে শূন্য হয়ে যায় রাজকোষ। প্রবল অর্থসংকটের কারণে বন্ধ হয়ে যায় নির্মাণকাজ। কাজটি সম্পূর্ণ না হলেও তৎকালীন সময়ে যে নৈপুণ্যতার সাথে পাথর খোদাই করে খিলান, স্তম্ভ, মূর্তি, বিভিন্ন নকশা কেটে অনন্য স্থাপত্য তৈরী হয়েছে তা জেলার শিল্প ইতিহাসকেই সমৃদ্ধ করেছে। কিন্তু উপযুক্ত রক্ষনাবেক্ষণ ও সংরক্ষনের অভাবে এই অপূর্ব স্থাপত্যটির অবস্থা আজ করুণ। পাথরের খাঁজে খাঁজে আগাছা বেড়ে ওঠায় উত্তরোত্তর ক্ষতি হচ্ছে এই স্থাপত্যের। পাথরগুলি আলগা হয়ে খুলে পড়ছে। তাই জেলার সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষজনের সাথে সাথে স্থানীয় বাসিন্দারা সকলেই চাইছে এটির আশু সংস্কার ও সংরক্ষণ।
বর্তমানে গড়জয়পুর সপ্তর্ষি নাট্যচর্চা কেন্দ্র নাম একটি সংস্থা এলাকার কচিকাঁচাদের নিয়ে একটি থিয়েটার বেসড স্কুল পরিচালনা করছে। নাট্যচর্চার মধ্যদিয়ে এই নাটমন্দিরের ইতিহাস ঐতিহ্যকে ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা তাদের মধ্যে লক্ষ্য করা গেল।
সত্যি এটাই যে পুরুলিয়ার ইতিহাসের এক উপেক্ষিত অধ্যায় এই নাট মন্দির। যা পড়ে আছে অনাদরে, অবহেলায়। তাই এই অনন্য স্থাপত্যটি সঠিক সংরক্ষিত হলে একদিকে যেমন প্রায় দেড় শতাধিক বছর ধরে চলে আসা এই এলাকার নাট্য চর্চার ইতিহাস রক্ষিত হবে, তেমনি রাজ্যের বহু মানুষ এই শিল্প স্থাপত্য চাক্ষুষ করবেন। বিকাশ ঘটবে পর্যটনের।
সন্দীপ সরকার
পুরুলিয়া