Story
পট শিল্প। বাংলার একেবারে লোকজ শিল্প। যার ছত্রে ছত্রে ধরা থাকে নানা পৌরাণিক উপাখ্যান। বাংলার বিভিন্ন পুজো পার্বণ, মেলাতে এই পটচিত্রের কদর ছিল একসময়। কালের হাওয়ায় যা ম্লান হয়েছে। একইসঙ্গে ফিকে হয়ে পড়ছে পট শিল্পীদের মাহাত্ম্য। তবু যারা এই বাংলার এদিকে ওদিকে এখনো পট শিল্পকে ধরে রেখেছেন, আজকের প্রতিবেদন তাঁদের নিয়েই। হারিয়ে যাওয়া পটুয়া শিল্পীদের কথাই উঠে এলো মেদিনীপুর থেকে বিজনেস প্রাইম নিউজের ক্যামেরায়।
দুর্গা পুজো শুধু উৎসব নয়। তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে সুবিশাল আর্থিক কর্মকাণ্ড। এই আর্থিক সমৃদ্ধির পথটা যতটা সহজ মনে হয়, আসলে ততটাই কঠিন। ছোট ছোট শিল্পীরা এখানে তাঁদের শিল্পসত্তার সম্পূর্ণ বিকাশ ঘটান। তার মধ্যে যেমন রয়েছেন বিভিন্ন হস্ত শিল্পী, তেমনই রয়েছেন কর্মকার, কুমোর সম্প্রদায়, মালাকার সম্প্রদায়ের মতন মানুষজন। কারণ তাঁরা দুর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে আশায় বুক বাঁধেন। তাদের হাতের কাজ যাতে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে ফুটে ওঠে। আয়ের পথ পরিষ্কার হয়। তেমনই একটি সম্প্রদায় হল পটুয়া সম্প্রদায়ের মানুষ। রামায়ণ, মহাভারত, কৃষ্ণলীলা, মনসামঙ্গলের মত বিভিন্ন উপাখ্যান সুর আর ছবির মাধ্যমে শুনিয়ে থাকেন তাঁরা। বাড়ি বাড়ি ঘুরে এই কাজটিই করেন। পরিবর্তে চাল, ডাল যেটুকুই জোটে, সেটাই বা কম কী। হতদরিদ্র এই সকল শিল্পীদের পেট চালাতে হয় এই ভিক্ষাবৃত্তি করে। তবু খিদের কাছে কোনভাবেই হেরে যায় না এই পটুয়া শিল্পীদের শিল্পসত্তা।
বছর দশ, পনেরো বছর আগে পটুয়া শিল্পীদের এতটাই খারাপ অবস্থা ছিল যে কালকের সংসার তাঁদের কিভাবে চলবে সেটা জানতে পারতেন না। ফলে মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছিলেন পটুয়া শিল্পীদের পরবর্তী প্রজন্ম। কিন্তু ফের বদলেছে হাওয়া। যুগের সাথে পাল্লাদিয়ে দূর্গাপুজোর বিভিন্ন মন্ডপ এখন থিমের ছোঁয়া রয়েছে।আর এ-র ফলে পটুয়া শিল্পীদের হাতের কাজ ব্যবহৃত হচ্ছে মন্ডপসজ্জায়। সঙ্গে দাঁড়িয়েছে সরকার। ফলে পটুয়া শিল্পীদের মুখে হাসি ফুটছে। বেঁচে রয়েছে এই ট্র্যাডিশনাল আর্ট ফর্ম।
টি-শার্ট, ওড়না, কুর্তি, পাঞ্জাবি এসবের পাশাপাশি বিভিন্ন হোটেলের ইন্টিরিয়র ডিজাইনের জন্য পটুয়া শিল্পীদের কদর এখন বাড়ছে। ফলে আগে যে কাজ শুধু ঘুরে ঘুরে ভিক্ষাবৃত্তি ছাড়া সম্ভব হত না, আজকের দিনে সেটা পসিবল হয়েছে কারণ পটুয়া শিল্পীদের আয়ের রাস্তা খুলে গেছে বিভিন্ন দিকে। সত্যি বলতে গেলে সরকার না থাকলে লোকশিল্প ধীরে ধীরে ভ্যানিশ হয়ে যেত। রাজ্য সরকারের উদ্যোগে যে লোকশিল্প ভাতা চালু হয়েছে, এতো পথ খুলে গেছে শিল্পীদের আয়ের যে তারা এখন অন্যত্র কাজের খোঁজ না করে পট শিল্পের মত লোকশিল্পে শুধু কনসেন্ট্রেট করছেন।
পূর্ব মেদিনীপুরের পাঁশকুড়া ব্লকের কেশববাড় গ্রামের পটশিল্পী বা পটুয়া শিল্পীরা এখন এই পুজোকে কেন্দ্র্রকরে আশায় বুক বেঁধেছেন। এই গ্রামে দশ-বারোটি পরিবার রয়েছে যারা বহু যুগ ধরেই পটশিল্পী হিসেবেই পরিচিত। আগে পেটের গান শোনাতেন গ্রামে গ্রামে গিয়ে। তবে সেই যুগ এখন শেষ। লক্ষ্মীলাভের আশায় তাঁরা এখন আরও নিজেদের শিল্পসত্তার প্রতি সচেতন হয়েছেন।
বর্তমান প্রজন্মের ছেলেমেয়েরাও একসময়ে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন পটের শিল্প থেকে। তবে বর্তমানে পটশিল্পীদের কদর বাড়ায় আবারো মনোনিবেশ করছেন বাপ ঠাকুরদাদের সেই হারিয়ে যাওয়া পট-শিল্পের প্রতি। আবারো পুরোনো ছন্দে গান বাঁধতে শুরু করেছেন পৌরানিক উপাখ্যান বা বর্তমান সময় উপযোগি বিষয় নিয়ে। রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে পাচ্ছেন সামান্য ভাতাও। ডাক পাচ্ছেন রাজ্য সহ ভিন রাজ্যে কোন মেলা বা পুজোয়। এবছর কোলকাতার ইকো পার্কে বসবে হস্তশিল্পীদের মেলা।তাই পুজোকে কেন্দ্র্রকরে লক্ষ্মী লাভের আশায় বুক বেঁধেছেন পাঁশকুড়ার কেশববাড় গ্রামের পটশিল্পীরা।
প্রসূন ব্যানার্জী
পূর্ব মেদিনীপুর