Story
পরিবেশ রক্ষার তাগিদে ৭০-এর দশকে শুরু হয়েছিল চিপকো আন্দোলন। অসাধু মানুষের হাত থেকে পরিবেশকে বাঁচানোর এই তাগিদ একটা সময় গোটা পৃথিবীর নজর কেড়ে নেয়। আজ বিশ্ব পরিবেশ দিবসে অনেকটা সেই আন্দোলনেরই ছায়া পড়ল সুন্দরবনবাসীর মধ্যে। যেখানে সুন্দরবনের জঙ্গল বাঁচাতে এবং তার সঙ্গে নদী বাঁধ রক্ষার জন্য এগিয়ে এলেন সকল স্তরের মানুষ। শিক্ষক, চিকিৎসক, পুলিশ থেকে বিমা কর্মী। কেউই বাদ রইলেন না। এমনকি গ্রামের মহিলারাও এই আন্দোলনে যোগ দিলেন। কারণ গোটা সুন্দরবনের শিয়রেই সংকট। তাই ত্রাণ নয় এখন পরিত্রান চাইছে সুন্দরবন।
পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে প্রায় ১০,০০০ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে সুন্দরী, গরান, হেতালের এই জঙ্গল। যার প্রভাব বাস্তুতন্ত্রের ওপর অনেকটাই। আর এই সুন্দরবনের ওপরেই নির্ভর করে এক বৃহৎ অংশের মানুষের জীবন, জীবিকা। ইয়াস এসে তাঁদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, একেবারেই ভালো নেই এখানকার মানুষ। বরং অনেকটাই বেড়েছে অনিশ্চয়তা। তার অন্যতম প্রধান কারণ, ফিশারি। জঙ্গলের পর জঙ্গল উধাও হয়ে যাচ্ছে। পরিবর্তে রাজনৈতিক কিছু নেতাদের মদতে সেখানে তৈরি হচ্ছে ফিশারি। যা একরকম এলাকাবাসীদের জন্য নিয়ে এসেছে ঘোর সংকট। আর তাই ম্যানগ্রোভ বাঁচানোর জন্য পাথরপ্রতিমার হেরম্বগোপালপুর থেকে শুরু হয়েছে ম্যানগ্রোভ দলের পক্ষ থেকে এই আন্দোলন।
কুয়েমুড়ির নদীবাঁধ ভেঙে দিয়ে তৈরি হয়েছে জলাশয়। আতঙ্ক বুকে নিয়ে এলাকাবাসীরা বেঁচে আছেন কোনরকমে। জল সংকট তীব্র, আর সর্বত্র অনিশ্চয়তা।
ফিশারি তৈরির জন্য গাছ কাটা হলেও গাছ লাগানো হচ্ছে কই? না তাকাচ্ছে সরকার, না দেখছে কেউ। অসাধু ব্যবসায়ীদের ব্যক্তিগত মালিকানার স্বার্থে আজ ফিশারিই যেন সুন্দরবনের ক্ষতি ডেকে এনেছে। যেভাবে একের পর এক গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে তাতে হয়ত অদূর ভবিষ্যতে সুন্দরবন ডুবে যাবে জলের তলায়। নদী এবং সাগর গ্রাস করবে এলাকাবাসীদের।
ইয়াসের ভয়াবহতার ছাপ এখনও তাঁদের চোখে মুখে। ননাজল নেমে গেলেও মরা মাছ এবং কাঁকড়ার দুর্গন্ধে টেকা দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই কি অগতির গতি আছে শুধু ত্রাণেই? সুন্দরবন বাঁচাতে না পারলে বারবার বিধ্বস্ত হবেন এখানকার মানুষেরা। আর সরকারকেও বারবার ত্রাণ দিয়ে যেতে হবে। কিন্তু সুন্দরবনের মানুষেরা ত্রাণ চাইছেন না। তাঁরা পরিত্রাণ চাইছেন।
ফিশারি তৈরি বন্ধ করে আরও গাছ রোপণ করে সারিয়ে দিতে হবে সুন্দরবনের ক্ষত। মানুষের তৈরি এই ক্ষত মানুষ সচেতন না হলে সারবেও না। আর যদি একবার মানুষ এই ক্ষত সারিয়ে ফেলতে পারে তাহলে গ্রাম থেকে গ্রাম ভেসেও যাবে না। পরিবারগুলোর জীবনে নেমে আসবে না অশনি সংকেত। আর নয় বাঁধ রক্ষার নামে প্রহসন। বেঁচে উঠুক সুন্দরবন। অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে সরকার কড়া পদক্ষেপ নিয়ে অরণ্যকে রক্ষা করুক ধ্বংসের হাত থেকে। আজ বিশ্ব পরিবেশ দিবসে এই বার্তাই ছড়িয়ে দিচ্ছেন তাঁরা।
নবাব মল্লিক, পাথরপ্রতিমা