Story

তখনও স্বাধীন হয়নি ভারত। সেই সময় একমাত্র ব্রিটিশদের মধ্যেই চল ছিল চায়ের সঙ্গে বিস্কুট খাওয়ার। কিন্তু সেই সকল বিস্কুটের দাম এতটাই বেশি থাকত যে সাধারণ ভারতবাসী বিস্কুট কিনে খাওয়ার মত বিলাসিতা দেখাতে পারত না। এই বিষয়টা ভাবাল এক রেশম ব্যবসায়ীকে। স্বদেশী আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ তিনিও। চাইলেন আপামর ভারতবাসীর মুখে বিস্কুট তুলে দিতে। একেবারে কম দামে। ৯০ বছর আগের এই ইতিহাসটাই উজ্জ্বল করল গোটা ভারতের এফএমসিজি ইন্ডাস্ট্রির ছবিটাকে। সকলের কাছে তুমুল জনপ্রিয়তা নিয়ে হাজির হল পার্লে-জি।
পার্লে কোম্পানির পথচলা শুরু আজ থেকে ৯৩ বছর আগে, ১৯২৯ সালে। মুম্বইয়ের ভিলে পার্লেতে। পার্লে কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন মোহনদয়াল চৌহান। যিনি নিজে ছিলেন একজন রেশম ব্যবসায়ী। সেই সময় দেশজুড়ে চলছে স্বাধীনতা আন্দোলনের জোয়ার। এদিকে ব্রিটিশদের আধিপত্যে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে দেশবাসীকে। ব্রিটিশদের মধ্যে বিস্কুট খাওয়ার চল তো ছিলই। আর সেখানেই বড়সড় ধাক্কা খেল ব্রিটিশরা। ১৯২৯ সালে সুদূর জার্মানি থেকে মেশিন আনিয়ে মোহন দয়ালের পথচলা শুরু হল অরেঞ্জ ক্যান্ডি দিয়ে। তারপর ১৯৩৯ সালে বিস্কুট নিয়ে হাজির হল পার্লে। বিস্কুটের দাম এতটাই কম রাখা হয়েছিল যাতে সকল ভারতবাসীই পেতে পারে সেই বিস্কুটের স্বাদ। কিন্তু সেই সময় এর কোন ব্র্যান্ড নেম ছিল না। কিন্তু পার্লেতে বিস্কুট ফ্যাক্টরি ছিল বলে লোকমুখে জনপ্রিয়তা পেল পার্লে হিসেবেই। তারপর এর নাম রাখা হল পার্লে গ্লুকোজ। বলাই বাহুল্য, জনপ্রিয়তা এমন জায়গায় পৌঁছল যে পার্লে কোম্পানির বিস্কুটের সেল কয়েক বছরের মধ্যেই বৃদ্ধি পেল ১২০ শতাংশ। এই অভাবনীয় উত্থান দেখে বেশ কিছু সংস্থা বিস্কুটের ব্র্যান্ড নেমে গ্লুকোজ ব্যবহার করতে শুরু করে। দেখা যায় আইডেন্টিটি ক্রাইসিস। শেষে ১৯৮২ সালে বিস্কুটের নাম রাখা হয় পার্লে-জি।
পার্লে-জির যাত্রা এরপর আর থেমে থাকেনি। যতই পেরিয়েছে সময়। ততই বেড়েছে চাহিদা। একটা সময় পার্লে-জি বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বিক্রিত বিস্কুট হিসেবে পরিচিতি পায়। ভারতের এফএমসিজি সেক্টরে পার্লে কোম্পানি হয়ে ওঠে এক বিশ্বস্ত ব্র্যান্ড। ২০১৩ সালে ৫ হাজার কোটি টাকার সম্পদ বাড়িয়ে ভারতের প্রথম এফএমসিজি ব্র্যান্ড হিসেবে উঠে আসে পার্লে। তারপর ২০১৭-১৮ সালে সেই ব্যবসার অঙ্ক পৌঁছয় ৮ হাজার কোটি টাকায়। এখন পার্লে-জি বিস্কুটের দাম ১৯৯০ সাল থেকে রাখা হয়েছিল মাত্র ৫ টাকা। সেই থেকে এখনো পর্যন্ত দামের কোন হেরফের হয়নি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, যেখানে প্রতিদিন র মেটেরিয়ালের দাম বাড়ছে সেখানে একটি সংস্থা কিভাবে এতো লো প্রফিট মার্জিন রেখেও নিজের ব্যবসাকে ছড়াতে পারল? এখানেই রয়েছে পার্লে কোম্পানির একসেপশনাল বিজনেস স্ট্র্যাটেজি।
জানা যায়, দিনে ১১৫ টন বিস্কুট তৈরি করতে সংস্থাটির র মেটেরিয়াল নষ্ট হয় মাত্র ১ শতাংশ। একইসঙ্গে সংস্থাটি র মেটেরিয়াল কিনতে কোন মিডলম্যানের উপর ভরসা করে না। বরং ডিরেক্ট সোর্স থেকেই সংগ্রহ করে সংস্থাটি। সংস্থার কর্মীরা প্রত্যেকেই হাইলি প্রোডাকটিভ। সময়ের গুরুত্ব তাঁরা ভালো বোঝেন। এছাড়াও প্যাকেজিংয়ের পেছনে পার্লে-জি তেমন একটা খরচ বহন করে না। আগে ওয়াক্স পেপার ব্যবহার করা হলেও এখন ব্যবহার করা হয় স্রেফ প্লাস্টিক। এছাড়া সংস্থাটি বিস্কুটের দাম এক রেখেও ব্যবসা বৃদ্ধি করতে পেরেছে, তার অন্যতম কারণ হল, ১৫-২০ বছর আগে ৫ টাকায় কেনা পার্লে-জির একটি বিস্কুট প্যাকেটের ওজন ছিল ৯০-১০০ গ্রাম। এখন তারা দাম এক রাখলেও প্যাকেটের ওজন কমিয়ে করেছে ৫০-৬০ গ্রাম মতন। একবার পার্লে তার বিস্কুটের দাম ৫০ পয়সা বাড়ানোয় তাদের বিক্রি নামে একেবারে তলানিতে। সংস্থা বুঝতে পারে এটা তাদের প্রাইস সেনসিটিভ একটি প্রোডাক্ট। অর্থাৎ দাম বৃদ্ধিতে তারা নিতে চায়নি কোনরকম ঝুঁকি। পরিবর্তে সংস্থাটি নিজের ব্যবসা বৃদ্ধির জন্য যেমন তার অন্যান্য প্রোডাক্ট মোনাকো, ক্র্যাক জ্যাক বা হাইড অ্যান্ড সিকে হাই প্রফিট মার্জিন রাখে তেমনই সেটাই প্রকারান্তরে পুষিয়ে দেয় পার্লে-জির লো-প্রফিট মার্জিনকে।
বর্তমানে গোটা ভারতে পার্লে সংস্থার ফ্যাক্টরির সংখ্যা ১৩০টিরও বেশি। যেখান থেকে প্রতি মাসে ১০০ কোটি পার্লে-জি বিস্কুটের প্যাকেট ম্যানুফ্যাকচার করা হয়। আজ পার্লে-জি বিস্কুট ভারতের এফএমসিজি সেক্টরের এক চলমান ইতিহাস। তেমনই সংস্থার বিজনেস স্ট্র্যাটেজিও তৈরি করেছে এক অনবদ্য নজির। যা পার্লে-জির এই নাটকীয় উত্থানকে তুলে ধরে সবার সামনে।
বিজনেস প্রাইম নিউজ
জীবন হোক অর্থবহ