Daily
পলাশের জেলা পুরুলিয়া। বসন্তের আগমনবার্তা নিয়ে সে হাজির হয়। রাঢ়বাংলার এই জেলার গাছগুলো সেজে ওঠে রক্তপলাশে। ফুল ফোটে, ঝরে যায়। আবার সেই ফুল ফোটে। কিন্তু ঝরে যাওয়া ফুল…সে তো নষ্ট হয়। এদিকে শীতের শেষ এবং বসন্তের শুরু মানেই বাংলার দোরে হাজির হয় বসন্ত উৎসব। আট থেকে আশি সকলেই মেতে ওঠেন রঙের খেলায়। কিন্তু সেই রঙে থাকে ভেজাল। উৎসবের আনন্দ ম্লান হয়ে যায় তারপর। আর যে কারণে ঝরে যাওয়া পলাশ ফুল দিয়েই তৈরি হচ্ছে আবির। তৈরি করছেন পুরুলিয়ার স্বনির্ভর দলের মহিলারা। আর তাঁদের সাহায্য করছে পুরুলিয়া সিধো কানহো বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিদ্যা বিভাগ। কর্মব্যস্ততা এতটাই বেড়েছে যে তাদের নাওয়া-খাওয়ার সময় নেই। আর এই গোটা কর্মকাণ্ড এবার নিজের চোখে দেখে এলেন বিজনেস প্রাইম নিউজের প্রতিনিধি। মহিলাদের উপার্জনের পথটা ক্যামেরাবন্দি হল।
প্রাকৃতিক বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে ভেষজ আবির। শুধু পলাশ নয়। বিট, কাঁচা হলুদ, হলুদ গুঁড়ো, পালং শাক, লিপস্টিক ট্রি-এর বীজের মতন বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে নানা রঙের আবির তৈরি করছেন গ্রামের মহিলারা। এই সমস্ত উপকরণের সঙ্গে জল মিশিয়ে নির্যাস বের করে তৈরি করা হচ্ছে বিভিন্ন রং। সেই তরল রঙে মেশানো হচ্ছে ট্যালকম পাউডার, অ্যারারুটের মতন বিভিন্ন উপকরণ। তারপর তৈরি করা হচ্ছে মিশ্রণ। সেই মিশ্রণের মণ্ড তৈরি করে শুকোতে দেওয়া হচ্ছে ছাওয়ায়। শুকিয়ে গেলে গুঁড়ো করে তৈরি করা হচ্ছে আবির। এই সম্পূর্ণ প্রসেসটা শেখানো হচ্ছে গ্রামের মহিলাদের। তাঁরা প্রশিক্ষণ নিয়ে আবির তৈরিতে উঠেপড়ে লেগেছেন। এই বিষয়ে তাঁরা কি বলছেন শুনে নেওয়া যাক।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিদ্যা বিভাগের অধ্যাপকরা এই উদ্যোগ নিয়েছেন। তাঁরা হাতে কলমে পাশে দাঁড়িয়ে থেকে শেখাচ্ছেন আবির তৈরি। ভেষজ আবির একেবারে পরিবেশবান্ধব। ত্বকের জন্যও উপকারি। তাই স্বাস্থ্য সচেতন বহু মানুষ ইদানিং ভেষজ আবির দিয়েই রং খেলতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। আর যে কারণে বাজারে চাহিদাও বাড়ছে ভালোরকম। তাই মহিলাদের যদি ভেষজ আবির তৈরির প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, তাহলে আবির তৈরির জন্য আর চিন্তা করতে হবে না। ফলে একদিকে যেমন আয়ের পথ বাড়বে, তেমনই অন্যদিকে সমাজকে একটা দিশা দেখানো যাবে। উপকৃত হবেন গ্রামের মহিলারা।
এমনকি পুরুলিয়ার বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশু এবং দুঃস্থদের এই আবির তৈরিতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। তাঁরা একদিকে যেমন আয়ের রাস্তা খুঁজে পাবেন, তেমনই ভেষজ আবির তৈরি করার সময় তাঁদের মুখেও ফুটে উঠবে হাসি। অনেকটা পলাশের মতন। উৎসবের দিনে সেই হাসি ম্লান তো হবেই না, বরং তাঁদের আগামীতে বেড়ে ওঠার জন্য একটা ভিত তৈরি করে দেবে। আর সেই কাজ করছে জেলার বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশু ও দুঃস্থদের প্রশিক্ষন কেন্দ্র বন্ধু।
এই বছর প্রায় ৫ কুইন্টাল আবির তৈরির লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। তার মানে আবিরের চাহিদা যে কি ভীষণ বাড়ছে, সেটা কোয়ান্টিটি দেখে অনুমান করা একেবারেই সোজা। স্বাভাবিকভাবেই মহিলাদের এখন কর্মব্যস্ততা তুঙ্গে। বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রে জেলার প্রশাসনিক স্তর থেকেও সহায়তা করা হচ্ছে। চাহিদা কেমন এই বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে হাসি দেখা গেল আরেক স্বনির্ভর দলের মহিলা সাবিত্রী মাহাতোর ঠোঁটে।
স্বনির্ভর দলের মহিলাদের সাথে সাথে, উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের ছাত্রছাত্রীরাও এই উদ্যোগে সামিল হয়েছেন। আগামীদিনে, অর্থ রোজগারের একটি বিকল্প পথ হয়ে উঠতে পারে এই ভেষজ আবির। একটি হিসাব করে দেখা যাচ্ছে, ৫০ কেজি আবির তৈরী করে তা বাজারজাত করতে খরচ হয় ৩হাজার টাকা। কমপক্ষে, ২০০টাকা কেজি হিসাবেও বিক্রি করলে ১০হাজার টাকা আয় হতে পারে। সুতরাং, লাভের অঙ্ক দাঁড়ায় ৭ হাজার টাকায়, যা কোন অংশেই কম নয়। স্বাভাবিকভাবেই, আজ পুরুলিয়া জেলায় ভেষজ আবির যে আবির শিল্পে একটা বিপ্লব এনে দিয়েছে সে কথা বলাই যায়।
সন্দীপ সরকার
পুরুলিয়া