Story
পৃথিবীর আজ বড়ই অসুখ। সেই অসুখের নাম দূষণ। এই দূষণের অন্যতম কারণ প্লাস্টিক। প্লাস্টিকের যথেচ্ছ ব্যবহার আজ পৃথিবীর স্বাস্থ্যকে দাঁড় করিয়েছে খাদের মুখোমুখি। তাই কেন্দ্রীয় সরকারের তরফ থেকে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক, প্লাস্টিকের গ্লাস বা কাপের তাণ্ডব বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গেল বছর ১ জুলাই সেই নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। এরপর ১২০ মাইক্রনের নিচে প্লাস্টিক ক্যারিব্যাগ নিষিদ্ধের তালিকায় আনা হয়েছে ৩১ শে ডিসেম্বর ২০২২ থেকে। তবু তারপরেও প্লাস্টিক ব্যবহারে লাগাম পড়ানো যাচ্ছে কই? অর্থাৎ দূষণের বাড়বাড়ন্ত আটকানো সম্ভব হচ্ছে না। কিন্তু তাই বলে চুপ করে মুখে কুলুপ এঁটে বসে নেই নিনফেট। প্লাস্টিকের পরিবর্তে পাটের ব্যবহার, সঙ্গে ন্যাচারাল লেদার প্রসেসিং-এর জন্য হাজারো কেমিক্যালের ব্যবহার বন্ধ করা এবং ন্যাচারাল লেদারের জন্য পশু হত্যা না-করেও কিভাবে পৃথিবীর সার্বিক দূষণরোধ সম্ভব সেই নিয়েই তৎপর রয়েছে নিনফেট। তার প্রমাণ পাওয়া গেল আইসিএআর-নিনফেট যখন তাদের কলকাতা ক্যাম্পাসে ৮৫ তম জন্মদিন পালন করল।
এই অনুষ্ঠানে ৮৫ বছর ধরে নিনফেট তাদের ইতিহাসের কথা তো বলেছেই। তার সঙ্গে ভবিষ্যতের প্ল্যান প্রোগ্রাম নিয়েও বেশ কিছু আলোচনা সেরেছে। এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আইসিএআর নিনফেটের মাথারা। সঙ্গে বেশ কিছু বরিষ্ঠ বৈজ্ঞানিক, যাদের উপস্থিতি অনুষ্ঠানের গুরুত্বকে অনেকটা বাড়াতে সাহায্য করেছে। তার অন্যতম কারণ এই অনুষ্ঠানে এমন কিছু বক্তব্য উঠে এসেছে, যা নিনফেটের মাধ্যমে যদি সমাজের সর্বস্তরে পৌঁছে দেওয়া যায় সেক্ষেত্রে আখেরে লাভ হবে সমাজের। উন্নত হবে ইকো ফ্রেন্ডলি সোশিও-ইকোনমিক স্ট্রাকচার। কারণ, কৃষক থেকে স্টার্ট-আপ শুরু করতে চাইছেন এমন বহু মানুষ কর্মসংস্থানের দারুণ একটা সুযোগ খুঁজে পাবেন। বিষয়টা আরও একটু পরিষ্কার করে বলা যাক। আমরা সকলেই আর্টিফিশিয়াল লেদারের বিভিন্ন সামগ্রী ব্যবহার করতে অভ্যস্ত। এই আর্টিফিশিয়াল লেদার প্রসেস করার পেছনে যে-সকল কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয় তার অধিকাংশই পেট্রোলিয়ামজাত। ফলে, ঐ সামগ্রী টেঁকসই তো হয় কিন্তু পরিবেশের ক্ষতি হয় চরম। আবার অন্যদিকে ন্যাচারাল লেদার ব্যবহার করার জন্য যে কেমিক্যালের ব্যবহার রয়েছে, সেটাও ক্ষতিকারক। সুতরাং বুঝতে অসুবিধা হবার কথা নয় যে, কম দামে দীর্ঘদিন ব্যবহারের জন্য যে সামগ্রী আমরা কিনছি, আদতে সেটা আমাদেরকেই ভবিষ্যৎকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিতে পারে। অতএব, উপায় কি? নিনফেটের সাহায্য নিয়েই এক সিনিয়র সায়েন্টিস্ট ডঃ শান্তনু বসাক উপায় বাতলে দিলেন। তিনি নিনফেটের দীর্ঘদিনের সফরসঙ্গী। কিন্তু এই প্রোজেক্টে কাজ করছেন দু’বছর হল। শুনে নিন, তিনি কি উপায় বের করেছেন।
শুধু কথা শুনলেই বা বিশ্বাস করবেন কেন সকলে? তাই নিনফেটের এই বিশিষ্ট বৈজ্ঞানিক হাতে করে নিয়ে এসেছেন একটি ওয়ালেট। দেখলে বা হাতে ধরলে বুঝতেই পারবেন না যে সেটা কোনরকম আর্টিফিশিয়াল লেদার থেকে তৈরি করা হয়েছে। তবে বলতে পারি, এই ওয়ালেট কিন্তু একদিকে যেমন টেঁকসই হবে তেমনই কম দামে পাবেন সাধারণ মানুষ। তার জন্য বাজারে এই ধরণের সামগ্রী আসাটা প্রয়োজন। প্রত্যক্ষভাবেও যে এটি দুর্দান্ত কর্মসংস্থানের ইঙ্গিত দিচ্ছে, সেটা আশা করি বলে দেবার প্রয়োজন নেই।
মাঝারি এবং ক্ষুদ্র শিল্পের উন্নয়ন ঘটবে কি করে? এই প্রশ্নটা যদি ছুঁড়ে দেওয়া হয় নিনফেটের কাছে, তাহলে বলতে হবে, নিনফেট যেভাবে প্রযুক্তি এবং বিজ্ঞানকে ব্যবহার করছে, সেটা একমাত্র ন্যাচারাল ফাইবার বেসড পণ্য বিকল্প হিসেবে এনে দেখানো সম্ভব। তার জন্য নিনফেট বরাবর জোর দিয়ে আসছে পাটের ওপর। ভারত এবং বাংলাদেশ ছাড়া পাটের প্রভূত উৎপাদন বিশ্বের আর কোথাও হয় না। আর পাট এমনিতেই অন্যান্য গাছের থেকে প্রচুর পরিমাণ কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করে নেয়। সুতরাং, পাটের ব্যবহার বাড়িয়েই আমরা অনেক কিছু তৈরি করতে পারি। পাট দিয়ে শুধু বস্তা হয়, এই দিন আজ চলে গেছে। পাট দিয়ে জামা-কাপড়ও তৈরি হতে পারে। যা তৈরিতে এগিয়ে এসেছে এনআইএফটি। এগুলো একদিকে পরিবেশ রক্ষার কাজে যেমন সাহায্য করবে, তেমনই আবার অন্যদিকে কর্মসংস্থানের দিশা দেখাবে। তারও প্রমাণ দিলেন আরেক বৈজ্ঞানিক ডঃ কার্ত্তিক কুমার সামন্ত।
পাট চাষ যে এত ব্যপক পরিমাণে হয় তার জন্য দায়ি এখানকার আবহাওয়া। যদিও দুর্ভাগ্যের বিষয় যে আমরা সাধারণ মানুষরা পাটের গুণাগুণ সম্পর্কে তেমন একটা ওয়াকিবহাল নই। আমাদের প্রত্যেকের জানা উচিৎ যে পাট আমাদের জন্য কতটা ইকো-ফ্রেন্ডলি সোশিও ইকোনমিক স্ট্রাকচার তৈরি করতে সাহায্য করতে পারে। জানলে, পাটের তৈরি সামগ্রী ব্যবহার করতে আমরা আর পিছ পা হব না। অবশ্য এটাও ঠিক যে, পাট জাত পণ্যের রফতানি এখন ভারতের বাইরে অনেকটা বেড়েছে। তাই পাটের সামগ্রী হেলফেলা করার নয়। এই ছবিটা আমাদের কাছে স্পষ্ট করেছেন আইসিএআর ক্রাইজাফের ডাইরেক্টর ডঃ গৌরাঙ্গ কর। আর পাটের ভবিষ্যৎ যে কতটা মজবুত সেটাও উঠে এসেছে ওনার বক্তব্যে। তার জন্য ভবিষ্যতের কিছু প্ল্যান প্রোগ্রাম রয়েছে। একবার শুনে নেওয়া যাক।
আর সবার শেষে এই এত যাগযজ্ঞ করে নিনফেট ফাউন্ডেশন ডে অনুষ্ঠিত করল, সেই অনুষ্ঠানের সার কথা কী? সেই বিষয়ে ছোট্ট করে পুরো বিষয়টা ব্যাখ্যা করলেন ডঃ দীনেশ বাবু শাক্যয়ার, যিনি আইসিএআর-নিনফেটের ডিরেক্টর। তিনি কি বললেন, শুনে নেওয়া যাক। একইসঙ্গে শুনে নেব আইসিএআরের এগ্রিকালচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ডিডিজি ডঃ এস এন ঝা কি বলছেন দেশবাসীর উদ্দ্যেশ্যে।
তার মানে বুঝতেই পারছেন যে নিনফেটের ভবিষ্যৎ প্ল্যান-প্রোগ্রাম কতটা মজবুত। তাই এবার ফাউন্ডেশন ডে-তেই আইসিএ আর নিনফেট, কলকাতায় ন্যাচারাল ফাইবার ফর সাবস্টেনেবল সোসিয়েটল ডেভলপমেন্ট শীর্ষক এক ন্যাশনাল কনফারেন্সের আয়োজন করে। ফাউন্ডেশন ডে র উদ্বোধনী মঞ্চে বিভিন্ন বিষয়ের উপর লিফলেট প্রকাশিত হয়, পুরস্কৃত করা হয় বিভিন্ন বিভাগের কৃতিদের। ফাউন্ডেশন ডে অনুষ্ঠানকে সফল করতে বিভিন্ন কৃষিবিজ্ঞান কেন্দ্র, বিভিন্ন এনজিও,নিনফেট সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদিত ন্যাচারাল ফাইবারের দ্রব্যাদি প্রদর্শন করেন।
সুব্রত সরকার