Story
তিলোত্তমা কলকাতার অপর নাম কল্লোলিনী কলকাতা। কেউ বলেন জনারণ্যের শহর হল কলকাতা। কেউ বলেন, পৃথিবীতে মিছিল নগরীর আরেক নামই হল কলকাতা।
ক্যালিফোর্নিয়া থেকে কলকাতা। সব শহরই করোনায় হারিয়েছে প্রাণের স্পন্দন। শহর জুড়ে যেন শুধুই আজ বিষন্নতার ছায়া। করোনায় গোটা শহরটা হয়ে গিয়েছে যেন বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মত।
তিলোত্তমা কলকাতার যমজ বোন নিউ টাউন রাজারহাট। এখানেও ছবিটা যেন মোটামুটি এক। তাই নিউইয়র্ক থেকে নিউটাউন আজ বাধা পড়েছে একই সুতোয়।
জনারণ্যে ভারাক্রান্ত শহর কলকাতার নতুন ফুসফুস নিউ টাউন। সেলুলয়েডের পর্দায় দেখা শহরগুলোর সাথে বড় মিল এই নিউ টাউনের।
নতুন শহরে অচেনা জায়গায় চেনা মানুষদের দেখা পাওয়াটাই ভার। সেই অচেনা শহরে মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সামান্য মানুষের অসামান্য হয়ে ওঠার কাহিনীর নাম নিউটাউন ফোরাম এন্ড নিউজ। যা সংক্ষেপে এন টি এফ এন। আর সব গল্পের মত এই গল্পের নায়কের নেই কোনো মেকআপ। নেই কোন ভ্যানিটি ভ্যান। আছে শুধুই বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অফুরন্ত স্পৃহা। হ্যাঁ ঠিকই ধরেছেন। ইনি নিউটাউন ফোরাম এন্ড নিউজের কর্ণধার সমরেশ দাস।
সেই শুরু ২০১৮ থেকে। আম্ফান থেকে বুলবুল। করোনা থেকে ইয়াস। প্রতিটা ঘটনায় ভলেন্টিয়ার জোগাড় করে দাঁড়িয়েছেন মানুষের পাশে। কেমন ভাবে দাঁড়িয়েছেন মানুষের পাশে খোঁজ নিতে বিজনেস প্রাইম নিউজের পুরো টিমটাই ঢুকে পড়ল এন টি এফ এফেনের ওয়ার রুমে।
খোঁজ করতেই দেখা মিলল এই গল্পের নায়কের। বিশ্ব বাংলা গেটের কাছেই ভলেন্টিয়ারদের নিয়ে একটা বাসস্টপে মিটিং করছিলেন। এত বিপুল কর্মযজ্ঞ। কিভাবে সামলাচ্ছেন। তাও আবার করোনার সময়।
করোনা রোগীদের নিয়ে মানুষ যখন নাজেহাল। বলা ভালো দিশেহারা। ঠিক তখনই এন কে ডি এর সহযোগিতায় ১২ নম্বর ট্যাঙ্কের কাছে তৈরি করলেন ২৫ শয্যার ট্রানজিট পয়েন্ট। তাও আবার অক্সিজেন ফেসিলিটি সহ। সম্পূর্ণ নিখরচায় রোগীরা এখানে মৃদু থেকে মাঝারি উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হচ্ছেন। চিকিৎসা পাচ্ছেন। রোগীরা মুক্ত কন্ঠে জানাচ্ছেন তাদের কৃতজ্ঞতা।
শুধুমাত্র নিউটাউন নয়। নদীয়া এমনকি নন্দীগ্রাম থেকেও রোগীরা এখানে আসছেন। চিকিৎসা নিচ্ছেন। ভালো হয়ে বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন। সুস্থ হয়ে। যার দরকার পড়ছে বড় হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার তাকে এখান থেকেই ভর্তির সহায়তা করা হচ্ছে। ব্যারাকপুর থেকে শ্রীবাস্তব বাবু এসেছেন মাকে নিয়ে। মা ভর্তি ছিলেন সাগর দত্ত হাসপাতালে। রাতে বাড়াবাড়ি হতেই অ্যাম্বুলেন্সে করে চলে আসলেন মাঝরাতে।
একটা ফেসবুক পেজ থেকে শুরু হওয়া ছোট গল্প আজ কাহিনীতে পরিণত হয়েছে। কাহিনী শোনালেন সংস্থার সাধারণ সম্পাদক।
অক্সিজেন সিলিন্ডার থেকে অক্সিজেন কনসেনট্রেটর। সবই আছে এদের ঝুলিতে। তাও আবার সাধারণ মানুষের জন্য। সম্পূর্ণ বিনা পয়সায়।
গোটা নিউটাউনকে দশটা টাওয়ারে ভাগ করে কাজ করে চলেছে এই সংস্থা। কেয়ারটেকার থেকে, বাড়ির পরিচারিকার ছেলে মেয়েরা যাতে পড়ালেখা করে মানুষ হতে পারে তাও রয়েছে এদের নজরে।
রাত নেই দিন নেই। কল আসলেই ব্যস্ততার আর সীমা থাকে না এখানকার ভলেন্টিয়ারদের। রোগী ভর্তি থেকে অক্সিজেন। ভ্যাকসিন থেকে বাচ্চাদের পড়াশোনা সবটাই চলছে এখানকার বাসিন্দাদের সহযোগিতায়। যারা এন টি এফ এনের কাজে এগিয়ে এসেছেন স্বতঃস্ফূর্তভাবে। নিউটাউনের বাসিন্দাদের কমন প্লাটফর্ম হল নিউটাউন ফোরাম।
নিউটাউন ফোরাম যেন বইয়ের খোলাপাতা। স্বচ্ছতা এখানকার পরতে পরতে । এনাদের কাজে যারা হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন তারা যখন খুশি অফিসে এসে দেখছেন কাজ ঠিকঠাক মতো হচ্ছে কিনা। আর এখানকার ভলেন্টিয়ার থেকে নার্স সবাই এক বাক্যে খাতা খুলে দেখিয়ে দিচ্ছেন প্রতিদিনকার আপডেট।
দেশ ও রাজ্যজুড়ে যখন মানুষে মানুষে করোনা ঘটিয়েছে বিভেদ। ঠিক তখনই শুনশান এই নতুন শহরে মানুষের মুখে আবারও হাসি ফুটিয়েছে এই সংস্থা। অক্সিজেন নিয়ে যখন রাজ্য জুড়ে চলেছে কালোবাজারি। তখনও এনারা অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে মানুষের কাছে গিয়ে অক্সিজেন দেবার বিনিমযে অঙ্গীকার করিয়ে নিয়েছে দুটো চারাগাছ দান করার জন্য। করোনা যখন চলে যাবে ঠিক তখনই উপকৃত পরিবারগুলি নিজের হাতে এন কে ডি এ এর দেওয়া পার্কে বসাবেন এই গাছগুলিকে। যাতে পরিবেশকে সুস্থ নিঃশ্বাস দেওয়া যায়।
করোনা ক্লান্ত নতুন শহরের বুকে নতুন সূর্যের আলো নিউটন ফোরাম। এনারা বিশ্বাস করেন, একদিন সূর্যের ভোর হবেই।
বিজনেস প্রাইম নিউজ