Story
অশোকনগরের গোকুল খামার থেকে জলপাইগুড়ির সদর ব্লকের ব্রহ্মতল পাড়ায় নারায়ণবাবুর খামারের দূরত্ব হাজার কিলোমিটারেরও বেশি। কিন্তু অশোকনগরের গোকুল খামারের সঙ্গে নারায়ণবাবুর খামারের যেমন মিল রয়েছে তেমন অমিলও রয়েছে।
সামান্য চাষি থেকে জেলার প্রাণীসম্পদ বিকাশের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর হয়ে ওঠার জার্নিটা মোটেও সহজ ছিলনা পেশায় কৃষিজীবী নারায়ণ বিশ্বাসের। অশোকনগরের গোকুল খামারের কর্ণধার আজ সফল ব্যবসায়ী হয়ে জীবনে দাঁড়িয়েছেন ঠিকই কিন্তু নারায়ণবাবুকে ইতিমধ্যেই জলপাইগুড়ি জেলা পরিষদ জেলার প্রাণী পালকদের উৎসাহ ও পরামর্শ দিতে ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর হিসেবে নিয়োগ করেছে। সম্মানের সঙ্গে সঙ্গে জেলার প্রাণীসম্পদ বিকাশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার গুরু দায়িত্বও আজ চেপেছে নারায়ণবাবুর কাঁধে।
কৃষিকাজে যখন আর সংসার চলছিল না, নেমে এসেছিল সংসার জীবনে অনিশ্চয়তার ঘোর অন্ধকার ঠিক তখনই একটি মাত্র দানের গরুকে সম্বল করে আজ গড়ে তুলেছেন জেলার অন্যতম আধুনিক, বৈজ্ঞানিক গো-খামার।
শুধু প্রাণী পালনের মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি সদর ব্লকের এই চাষি। খামারের পাশে নিজের জমিতেই গরুর খাদ্যের উপযোগী হাইব্রিড নেপিয়ার ঘাস চাষ করেও তাক লাগিয়ে দিয়েছেন ষাটোর্ধ্ব এই প্রাণী পালক। দানের গরু থেকে বাড়তে বাড়তে আজ তাঁর খামারে গরুর সংখ্যা ১৫০। জার্সি, হলিস্টান, এইচএম সহ বিভিন্ন প্রজাতির গরু রয়েছে এই খামারে। রয়েছে গো পরিচর্যার জন্য আট জনেরও বেশি কর্মচারী।
প্রতিদিন প্রায় এই খামার থেকে ২৫০ লিটার দুধ তৈরি হয়। সেই দুধ শিলিগুড়ি সহ শহরের বিভিন্ন দোকানে যেমন যায় তেমনই বাড়িতে বাড়িতেও জোগান দেওয়া হয় এখানকার দুধ। আর বাড়তি দুধ দিয়ে নিজেই মিষ্টি, পনির তৈরি করে বিক্রি করেন নারায়ণবাবু। কেউ গো পরিচর্যা করছেন। কেউবা দুধ দোয়াচ্ছেন। সবটাই হচ্ছে চক্রাকারে। আর বাড়িতে থেকে যিনি ২৫ বছর ধরে পুরো বিষয়টি নজরদারিতে রাখছেন তিনি প্রভারানি বিশ্বাস। নারায়ণবাবুর সহধর্মিণী।
সংসারের হাল যখন বেহাল ছিল। ছিল চরম অনিশ্চয়তা। তখনও ভেঙে পড়েননি আজকের যিনি প্রাণীপালক সেই নারায়ণবাবু। নিজের খামারে দাঁড়িয়ে প্রসন্ন মুখে লাজুকভাবে বললেন অতীতের স্মৃতি হয়ে যাওয়া কথাগুলো। স্মৃতি তা যাই হোক, সেতো ভোলা যায়না।
এরপর ধীরে ধীরে যখন গরু বাড়ল তখন লোকজনেরও আনাগোনা বাড়ল এই খামারে। কেউ গরুগুলোকে পরিষ্কার করছেন স্প্রেতে জল দিয়ে, কেউ তাদেরকে খাবার দিচ্ছেন আর কেউ ঘাস কাটছেন- সবমিলিয়ে সারাদিনের কর্মযজ্ঞ চলে এখানে। আর সবথেকে বড় কথা দুধ এতটুকু যাতে ওয়েস্ট না হয় তার জন্য সাকশন মেশিন ব্যবহার করা হয়। (দুধ দোয়ানোর ফুটেজ দেখাতে হবে)
সবমিলিয়ে উত্তরবঙ্গের এই জেলায় প্রাণী পালনে প্রাণী পালকদের মধ্যে নজির গড়েছেন জলপাইগুড়ির সদরব্লকের ব্রহ্মতলার এই মানুষটি। যথারীতি স্বীকৃতিও মিলেছে। স্থানীয় প্রাণীসম্পদ দপ্তরের কাছে নারায়ণবাবু আজ আইকন।
কর্মচারীরাও আজ নারায়ণবাবুর পরিবারের সদস্য হয়ে উঠেছেন। কেউ খামারে কাজ করছেন সাত বছর, কেউ আট বছর। দু’বছরের লকডাউনে কর্মচারীদের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি যে নজির গড়েছেন তা ধরা পড়ল তারই কর্মচারী আবুল হোসেনের গলায়।
দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে তিলে তিলে গড়ে তুলেছেন তাঁর এই স্বপ্নের ইমারত। জীবনের চড়াই, উতরাই অনেক কিছুই দেখেছেন তিনি। সবকিছু দেখেশুনে কোনরকম পুঁজি না লাগিয়ে শুধুমাত্র দানের একটি গরু থেকে বলা যায় শূন্য থেকে বৃত্ত সম্পূর্ণ করার অপর নাম নারায়ণ বিশ্বাস। জেলা পরিষদের সহকারি সভাধিপতি দুলাল দেবনাথ তো পরিষ্কার বলেই ফেললেন নারায়ণবাবুর কাজকর্ম জেলার প্রাণী পালকদের কাছে আজ মডেল। আমরা এটা ছড়িয়ে দেব কৃষকদের উৎসাহিত করতে।
দিন আসে দিন যায়। শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা জলপাইগুড়ি জেলায় থেমে থাকেনি একদিনও এই খামারের কাজ। আজ প্রায়ই তাঁকে ছুটে যেতে হয় জেলার এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত। মানুষকে পরামর্শ দিতে। অনেকেই আবার আসেন তাঁর কাছে পরামর্শও নিতে। তিনি যে জেলার ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর প্রাণী সম্পদে।
নবেন্দু বাড়ৈ, জলপাইগুড়ি