Story

সামনেই মকর সংক্রান্তি। মকর সংক্রান্তি মানেই বাঙালির হেঁশেলে ঢুকে পড়ে পিঠে পুলি। বাঙালির খাদ্যরসনায় যার নাম থাকে প্রায়োরিটি লিস্টের একেবারে উপরের দিকে। অন্তত এই সময়ের জন্য। আর পিঠেপুলি একেবারেই অধরা থাকে যদি না সঙ্গে থাকে ভালো গুড়। পিঠে,পুলি বা পায়েসের স্বাদ বাড়ে না এই গুড় ছাড়া। তা সে খেজুরের রস গুড় হোক কিংবা দানা গুড় কিংবা পাটালি। আর এই খেজুরের গুড় সবার পাতে তুলে দিতে নদীয়ার কৃষ্ণগঞ্জ ব্লকে বসে মাঝদিয়ার সবথেকে বড় খেজুর গুড়ের হাট। যা রাজ্যের সবচেয়ে বড় খেজুর গুড়ের হাট বলেই পরিচিত। বিজনেস প্রাইম নিউজের ক্যামেরায় ধরা পড়ল সেই হাটের এই সময়কার ব্যস্ততা।
এই গুড়ের হাটের বয়স একশো বছরেরও বেশি। শতাব্দী প্রাচীন এই হাটটি বসে প্রতি বুধ ও রবিবার। কৃষ্ণগঞ্জ ব্লকের সমস্ত গ্রামের প্রায় হাজার দুয়েক শিউলি হাটবার গুলিতে মাটির ভাঁড় করে এখানে খেজুর গুড় নিয়ে হাজির হন। মরশুম শুরু হয় কার্তিক মাসে। শেষ হয় ফাগুন মাসে। তবে বিক্রিবাটা তুঙ্গে ওঠে পৌষ সংক্রান্তির সময়। তাকে সামনে রেখেই জমজমাট থাকে গুড়ের হাট।
গত দু’বছর করোনা আবহে বাজারে মন্দা দেখা দিলেও এই বছর গুড়ের চাহিদা ফিরে আসায় যেমন খুশি শিউলিরা। তেমনি হাসি চওড়া হয়েছে ব্যবসায়ীদের। এই হাটে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা যেমন আসেন। তেমনি কলকাতা সহ বিভিন্ন জেলার গুড় ব্যবসায়ীরা এই হাটে জড়ো হন। শিউলিদের কাছ থেকে গুড় কিনে নিয়ে যান তাঁরা। শুধু কলকাতা বলেই নয়। খেজুর গুড়ের চাহিদা বেড়েছে অন্যান্য রাজ্যেও। তাই খেজুর গুড় এখন রাজ্যের বাউন্ডারি পেরিয়ে পৌঁছে যায় দিল্লি, বোম্বে, চেন্নাই, নাগপুর, অসম সহ বিভিন্ন রাজ্যে। এমনকি আন্তর্জাতিক বাজারেও ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা লাভ করছে খেজুর গুড়। পাড়ি দিচ্ছে রাশিয়া, আমেরিকা, কানাডাতেও।
কিন্তু শুধু গুড় তৈরি হলেই তো হল না। প্রয়োজন তার সঠিক সংরক্ষণ। আর সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত হয় হরেক আকৃতির মাটির ভাঁড়। যে ভাঁড়কে কেন্দ্র করেই এখানে গড়ে উঠেছে অনুসারি শিল্প হিসাবে শতাধিক কারখানা। মাজদিয়া এবং তার আশেপাশের গ্রামের এক-দেড়শো পরিবারের সংসার চলে মাটির ভাঁড় তৈরি করেই। বংশপরম্পরায় তাঁরা এই মাটির ভাঁড় তৈরি করে আসছেন।
এই হাটের অন্যতম গুরুত্ব রয়েছে পণ্য পরিবহনের। তার জন্য প্রয়োজন পড়ে ছোট, বড়, মাঝারি গাড়ি বা ভ্যানের। গুড়কে কেন্দ্র করে এই সময় তাদের ব্যস্ততা থাকে অনেকটাই। কর্মব্যস্ত পরিবহন কর্মীরা গুড় নিয়ে ছোটেন কলকাতাসহ রাজ্যের বিভিন্ন জেলায়।
গুড়ের হাটের ব্যস্ততা যখন তুঙ্গে তখন বিজনেস প্রাইম নিউজের ক্যামেরায় মুখোমুখি হলেন এই হাটের মালিক শঙ্কর ঘোষ। প্রায় চার বিঘের উপর ছড়ানো এই হাট সেই কবে থেকেই তাঁদের আয়কে এক স্থায়ী দিশা দেখিয়ে আসছে।
শতাব্দী প্রাচীন এই গুড়ের হাট বহু মানুষের জীবন জীবিকার এপিসেন্টার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই হাটে গুড় বয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য ঝুড়ি যেমন লাগে তেমনই প্যাকিংয়ের কাজে লাগে বিচালি, পেপার। সবমিলিয়ে এক বৃহৎ কর্মকাণ্ড চালু থাকে এখানে। এখনো সেই গতি রয়েছে অব্যাহত। তাই নির্দ্বিধায় বলাই যায়, মাজদিয়া খেজুর গুড়ের বাজার সুনাম অক্ষুণ্ণ রেখে পেরিয়ে চলেছে একেকটি বছর।
সুব্রত সরকার
নদীয়া