Tourism
হঠাৎ করেই মানুষের মুখে মুখে মরক্কোর নাম। হঠাৎ করে বলব না। কারণ, মরক্কো দেশটাকে নিয়ে নেট দুনিয়ায় চলছে জোর চর্চা। তার অন্যতম কারণ, চলতি বিশ্বকাপে নজির গড়েছে মরক্কো। পর্তুগালকে হারিয়ে মরক্কো সেমিফাইনালে মুখোমুখি হতে চলেছে ফ্রান্সের সঙ্গে। আফ্রিকার ইতিহাসে এই প্রথমবার। মরক্কো তাই আজ সবার প্লেস অফ ইন্টারেস্টের জায়গা হয়ে উঠেছে। তাই আজ আমরাও নিয়ে আসছি মরক্কো নিয়ে এমন একটি প্রতিবেদন, যা আগে কোনদিন আপনি নেট দুনিয়ায় দেখেননি। একমাত্র মরক্কো ঘুরে এলেই তেমন অভিজ্ঞতার সাক্ষী থাকতে পারবেন। আসুন, আজ মরক্কো নিয়ে তুলে ধরা যাক এক বিশেষ প্রতিবেদন।
একদিকে আটলান্টিক মহাসাগর এবং উত্তরে ভূমধ্যসাগরের সুনীল জলরাশি। এরই মাঝে প্রায় ৭ লক্ষ ১০ হাজার ৮৫১ বর্গ কিমি জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে মরক্কো। মরক্কোর আরবি নাম আলমামলাকাতুল মাগরিবিয়া। বলা হয়, আদি প্রস্তর যুগ বা যাকে আমরা ইংলিশে বলি প্যালিওলিথিক যুগ, সেই তখন থেকেই মরক্কোয় জনবসতির প্রমাণ পেয়েছেন গবেষকরা। এরপর অবশ্য বহু হাওয়া বয়ে যায় মরক্কোর ওপর দিয়ে। একটা সময় রোমান সাম্রাজ্যের আওতায় ছিল উত্তর আফ্রিকার দেশ মরক্কো। তারপর মুসলিমদের আগমন ঘটে এখানে। আরবি ভাষার প্রচলন শুরু হয় মরক্কোয়। তারপর থেকে মরক্কো মূলত মুসলিম প্রধান দেশ হিসেবেই থেকে গিয়েছে। ১৫৪৯ সাল নাগাদ মরক্কোর ভাগ্য নিজেদের হাতে নেয় আরব রাজবংশ। তাঁরা নিজেদের নবিজি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বংশধর বলে দাবি করেছিলেন। এরপর ধীরে ধীরে মরক্কোয় ফ্রান্স এবং স্পেন রীতিমতন ছড়ি ঘোরাতে শুরু করে। অবশেষে ১৯৫৬ সালে মরক্কো ফ্রান্সের হাত থেকে নিজেদের স্বাধীনতা ছিনিয়ে নিতে সক্ষম হয়। বর্তমানে মরক্কোর বাদশাহ হলেন ষষ্ঠ মুহাম্মদ। যিনি মরক্কোর বাদশাহ ২য় হোসেনের মৃত্যুর পর ১৯৯৯ সালে নিজের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। এই দেশের ৯৯% মানুষ ইসলাম ধর্মাবলম্বী। যাদের অধিকাংশ সুন্নি সম্প্রদায়ের। মরক্কো এমন একটি দেশ যার প্রাকৃতিক, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের টানে প্রতি বছর বহু পর্যটক চলে আসেন এখানে। সুনীল জলরাশি ছাড়াও মরক্কোর মধ্য দিয়ে চলে গিয়েছে আড়াই হাজার কিমি বিস্তৃত অ্যাটলাস পর্বতমালা। এছাড়াও মরক্কো পশ্চিম সাহারার দাবি করে আসছে বহুদিন ধরেই। সবুজ অরণ্য, সাদা বালি, সুউচ্চ পর্বতমালা থেকে শুরু করে প্রাচীন শহর, শহরের বাজার, রাস্তা-ঘাট এই সবই ঘুরতে আসা বহু পর্যটকদের কাছেই খুব সারিয়াল বলে মনে হয়। তাই ভ্রমণ প্রিয় মানুষদের জন্য মরক্কো নিয়ে কিছু কথা তুলে ধরতেই হবে।
মারাকেশঃ
বরফে ঢাকা অ্যাটলাস পর্বতমালার একেবারে পায়ের কাছে অবস্থিত মারাকেশ। মারাকেশ মরক্কোর চতুর্থ বৃহত্তম শহর। মারাকেশ শহরটি রাজধানী রাবাতের দক্ষিণ পশ্চিম দিকে অবস্থিত। এখানে পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণের জায়গা হল জামা এল ফিনা। জামা এল ফিনা মারাকেশের এমনই একটি এলাকা যা বহুযুগ ধরে প্রাচীন এবং বর্তমান সংস্কৃতির মিশেল ঘটিয়ে চলেছে দারুণভাবে। জামা এল ফিনা একটাসময় শিরশ্ছেদ করার জন্য খুব পপুলার ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বর্তমানে এই নগর চত্বরে তৈরি হয় দোকানপাট। রমরমিয়ে ব্যবসা চালু হয়। এখানে এলে গায়ক, বাদক, যাদুকর, আয়ুর্বেদিক ওষুধ বিক্রেতার মতন বহু মানুষের সঙ্গে আপনার সাক্ষাৎ হতে পারে। এছাড়াও রয়েছে এখানকার সবচেয়ে বড় মসজিদ কুতুবিয়া মসজিদ। প্রায় ৭৭ ফুট উঁচু এই মসজিদের মিনার। মসজিদটি তৈরি করা হয়েছিল ইয়াকুব আল-মনসুরের সময়। আর হ্যাঁ। মারাকেশের অর্থ হল লাল শহর। এখানকার বেশ কিছু বাড়ি লাল পাথরে তৈরি বলেই জায়গার নাম হয়েছে মারাকেশ।
ফেজ আল বালিঃ
মরক্কোর অন্যতম আকর্ষণের জায়গা হল এই ফেজ আল বালি। না, জায়গার সঙ্গে বালির কোন সম্পর্ক নেই। বরং বেনারসের গলিঘুঁজির সঙ্গে এর একটা মিল পেতে পারেন। কারণ, ফেজ আল বালিতে রয়েছে সরু সরু গোলকধাঁধাঁর মত গলি। গলিগুলো এতটাই সরু যে এই গলির ভিতর দিয়ে কোনরকম গাড়ি যাতায়াত করতে পারে না। তাই হেঁটে এই গলির মধ্য দিয়ে হাঁটলে আপনি দেখতে পাবেন, রাস্তার দু’পাশ জুড়ে রয়েছে বিভিন্ন দোকান, মসজিদ এবং মাদ্রাসা। একটি গাড়িও না-চলার কারণে ফেজ শহরটি বিশ্বের মোটরকার মুক্ত নগর হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এই শহরটি বর্তমানে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের অন্তর্গত।
তাঞ্জিয়ারঃ
বিখ্যাত মুসলিম চিন্তাবিদ, পর্যটক ইবন বতুতার নাম আমরা সকলেই জানি। ইবন বতুতা ১৩০৪ সালে এই তাঞ্জিয়ারেই জন্মগ্রহণ করেন। তবে শুধু ইবন বতুতাই নন। তাঞ্জিয়ার বহু যুগ ধরেই কূটনীতিবিদ, লেখক, চিন্তাবিদদের দুর্দান্ত একটি পীঠস্থান হিসেবে রয়ে গিয়েছে। মূলত সাদা চুনাপাথরের তৈরি একটি পাহাড়ের কোলেই অবস্থিত তাঞ্জিয়ার। সুনীল জলরাশির সঙ্গে এই সাদা চুনাপাথরের পাহাড়ে বসতি স্থাপনের দৃশ্য আপনাকে ভুলিয়ে রাখবেই। মূলত জিব্রাল্টার প্রণালীর দক্ষিণে অবস্থিত এই শহর। তাঞ্জিয়ার মরক্কোর খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বন্দর। এছাড়াও তাঞ্জিয়ারের অন্যতম নজরকাড়া জায়গা হল কাসবাহ। এই কাসবাহে একসময় মরক্কোর সুলতানরা নিয়মিত থাকতেন।
আর্গ চেবিঃ
মরক্কোর অন্যতম আকর্ষণ হল বালি। সাধারণত গাছপালাহীন অঞ্চলকে বলা হয় আর্গ। এখানে বেশ কিছু বালিয়াড়ি রয়েছে। যাদের উচ্চতা পৌঁছে প্রায় ৬৫০ মিটার পর্যন্ত। এখানে এসে মরুভূমির অনৈসর্গিক দৃশ্য আপনি উপভোগ করতে পারবেন উটের পিঠে চেপে। এছাড়াও ডেজার্ট হাইকিং, স্যান্ড বোর্ডিং আর্গ চেবির অন্যতম আকর্ষণ।
ভলিউবিলিসঃ
মরক্কোয় একটা সময় যে রোমান সম্রাটদের আধিপত্য ছিল, সেটা বোঝা যাবে যদি আপনি ভলিউবিলিস আসেন। এখানে এলে আপনি দেখতে পাবেন আর্গ চেবির একেবারে বিপরীতধর্মী একটি দৃশ্য। মূলত গমের ক্ষেত হওয়ার কারণে এটি সবুজ প্রান্তরে ঘেরা। তবে পর্যটকদের আকর্ষণের কারণ কিন্তু সবুজ প্রান্তরের জন্য নয়। বরং বলা যেতে পারে, ভলিউবিলিস এলে আপনি পেয়ে যাবেন রোমান সাম্রাজ্যের বিভিন্ন স্থাপত্যশৈলীর ধ্বংসাবশেষ। প্রচুর শিলালিপি, বিচিত্র নির্মাণশৈলী- এই সবই যেন ভলিউবিলিসকে এক অন্য মাত্রায় পৌঁছে দিয়েছে। খননকাজের মাধ্যমে ভলিউবিলিসে উদ্ধার হয়েছে রাজপ্রাসাদ, পার্লামেন্ট ভবনের মত একাধিক ঐতিহাসিক স্থাপত্য।
এমনিতেই আফ্রিকা মহাদেশটি অত্যন্ত সুন্দর। এই দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কথা মাথায় রেখেই বিভূতিভূষণের কলম থেকে বেরিয়েছিল চাঁদের পাহাড়ের মতন উপন্যাস। মরক্কো এই আফ্রিকা মহাদেশেরই একটি নিরবিচ্ছিন্ন অংশ। মহাসমুদ্র এবং বিস্তৃত পর্বতশ্রেণির মধ্যে অবস্থিত এই দেশটি ঘিরে পর্যটকদের আকর্ষণ বছর বছর যেন বেড়েই চলে। ২০২১ সালের একটি তথ্য থেকে জানা গিয়েছে, মরক্কো শুধুমাত্র পর্যটন খাত থেকে নিজেদের কোষাগারে ঢুকিয়েছে ৯ বিলিয়ন ডলার। সুতরাং, বলার অপেক্ষা রাখে না যে মরক্কোয় পর্যটকদের ঢল নামতে কোনরকম ভাটা পড়ে না। তাই আপনিও কিন্তু চাইলে একবার ঘুরে আসতে পারেন মরক্কোয়। সাক্ষী থাকতে পারেন ইসলামিক ইতিহাস, ঐতিহ্যের।
বিজনেস প্রাইম নিউজ।
জীবন হোক অর্থবহ