Story
মাটির পুতুল আর কৃষ্ণনগর জানেন না এমন কোন লোক এই বাংলায় খুঁজে পাওয়া যাবেনা। আর সেই পুতুলশিল্পীদের শোচনীয় দশা হয়েছে করোনা আর লকডাউনে। অনেক রাষ্ট্রপতি পুরষ্কারপ্রাপ্ত শিল্পী থেকে সাধারণ শিল্পীরা ব্যবসায় মন্দা পড়ায় দাবি তুলেছেন সরকারি সংরক্ষণের। আর সরকারি সংরক্ষণের রক্ষাকবচ কৃষ্ণনগরের মাটির পুতুলে আসলে সেই মাটির পুতুলশিল্পের জৌলুশ আরও বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করছেন এখানকার শিল্পীরা। আর সবচেয়ে বড় কথা রাজ্য সরকার যখন জেলায় জেলায় শিল্পকেন্দ্রগুলিতে এক্সপোর্ট ক্লিনিক খুলছেন, তখন সেই এক্সপোর্ট ক্লিনিকের দরজা যেন পুতুল শিল্পীদের ঘর পর্যন্ত এসে পৌঁছয়। এটাও দাবি করছেন এখানকার পুতুলশিল্পীরা। তাহলে সহজেই এখানকার পুতুল বিদেশে রপ্তানি করে সরকারি আবহে আবার চাঙ্গা হয়ে উঠতে পারবেন কৃষ্ণনগরের মাটির পুতুলশিল্পীরা।
আমেরিকা থেকে জাপান, ইংল্যান্ড থেকে ফ্রান্স- সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে কৃষ্ণনগরের পুতুলপট্টির পুতুল পৌঁছে যায় ঘরে ঘরে। ঐতিহ্য বাড়ে বাংলার। লাভবান হন শিল্পীরা। কিন্তু সময় প্রবাহে এই শিল্পের রঙই আজ একেবারে ম্লান।
একদিকে করোনার হানা, অন্যদিকে সরকারি উদাসীনতা। দুই সাঁড়াশি আক্রমণে কার্যত ধুঁকছে বাংলার এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প। কৃষ্ণনগর পুর এলাকার ঘূর্ণির পুতুলপট্টি যেন এই দুয়েরই শিকার। রীতিমত দিশেহারা এই পুতুলপট্টির হাজারেরও বেশি মৃৎশিল্পী। এঁদের মধ্যেই আবার ১০ জন শিল্পী রাষ্ট্রপতির হাত থেকে পুরস্কারও নিয়ে এসেছেন। কিন্তু আজ যেন সবই বৃথা মনে হয়। তার অন্যতম কারণ, পেটের টান। করোনার দু’বছরব্যপী এই দাপিয়ে বেরানোর ফল ভুগতে হচ্ছে তাঁদের। অর্ডার যেমন আসছে কম, তেমনই পর্যটকশূন্য ঘূর্ণি। আর পর্যটকের পা না পড়লে যে শিল্পীর ভাঁড়ারে টান পড়বে। কোথায় যাবেন তাঁরা?
১ ইঞ্চি থেকে শুরু করে কয়েক ফুট। কল্পনা এবং ভালোবাসার মিশেলে এই একেকটি পুতুল হয়ে ওঠে জীবন্ত। সূক্ষাতিসূক্ষ্ম এই কাজ যেন দিন আনা দিন খাওয়া মানুষগুলোর ছবিই বেশি করে উঠে আসে মৃৎশিল্পীদের আঙুলের টানে।
তাই পুতুলপট্টির শিল্পীরা চাইছেন সরকারি সাহায্য। তাঁদের দাবি, রাজ্য সরকারের নজর পড়ুক পুতুলপট্টির শিল্পীদের ঘরে ঘরে। শুধু চাল, ডাল নয়। শিল্পের খাতিরেই রাজ্য সরকার সচেতন হয়ে উঠুক।
একটা সময় এই পুতুলপট্টিতে দেখা যেত চরম ব্যস্ততা। আজ পর্যটনের বেহাল দশা যেন শিল্পীদের ঘরেও ডেকে এনেছে অজানা আশঙ্কার বার্তা। হারিয়ে গিয়েছে সেই আগের ব্যস্ততা। এমনকি বহু শিল্পীকেই পেটের জন্য বদলে ফেলতে হয়েছে পেশা। কেউ চালাচ্ছেন টোটো তো কেউ বেচছেন সবজি। পর্যটনের পাশাপাশি শিল্পীদের দুরবস্থা যেন আবারও দেখিয়ে দিল ভালো নেই পুতুলপট্টি। এখন তাঁদের দিকে সরকার কবে মুখ তুলে চাইবেন? কবেই বা আবার কৃষ্ণনগরে নেমে আসবে পর্যটকের ঢল? আর কবেই বা পুতুলপট্টির পুতুলগুলো শিল্পীর ছোঁয়ায় জীবন্ত হয়ে উঠবে? সেইদিকেই তাকিয়ে রয়েছেন কৃষ্ণনগর পুর এলাকার ঘূর্ণির মৃৎশিল্পীরা।
রনি চ্যাটার্জী, নদিয়া