Daily

মিড ডে মিলের খরচ কমিয়ে আনতে বিভিন্ন স্কুলে সব্জী – বাগান অর্থাৎ কিচেন গার্ডেন তৈরীর নির্দেশিকা দিয়েছে রাজ্যের শিক্ষা দপ্তর। তবে বেশ কিছু স্কুল রয়েছে যেখানে বেশ কয়েক বছর আগে থেকেই স্কুলের নিজস্ব এলাকাতে সব্জী বাগান তৈরী করে সেখানে উৎপাদিত আনাজ প্রতিদিনের মিড ডে মিলের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। এমনই একটি স্কুলের কথা আজ আমরা তুলে ধরবো – যেটি হলো পুরুলিয়া জেলার আড়ষা ব্লকের আড়ষা ২নং চক্রের অন্তর্গত কাঞ্চনপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়। ২০১২ সাল থেকে প্রায় ১২ বছর ধরে কিচেন গার্ডেন রয়েছে এই স্কুলটিতে। এতদিন ধরে বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীরা মিলে এই কাজ করছিলেন। বর্তমানে, আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে উৎকৃষ্টমানের ফসল উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে স্কুলের এই কাজে সহায়তা করতে এগিয়ে এসেছে আড়ষা ব্লক কৃষি দপ্তর ও আতমা প্রকল্প। এই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সলিল কুমার মাঝির বক্তব্য, আর্থিক ভাবে পিছিয়ে পড়া এই গ্রামটি মূলত আদিবাসীপ্রধান। গ্রামটিতে ১২১ টি পরিবারের বাস। বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা সংখ্যা ১১৬। দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসা এই সকল ছাত্রছাত্রীদের মধ্যাহ্ন ভোজনের আহারে যাতে পুষ্টিযুক্ত খাবার রাখা যায় সেই উদ্দেশ্য নিয়েই প্রায় ১২ বছর আগে সব্জিবাগান তৈরীর কাজ শুরু করা হয়। আজও তা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এই সব্জিবাগান থেকে সারা বছরই ঋতু অনুযায়ী ফুলকপি, বাঁধাকপি বেগুন থেকে শুরু করে ঢেঁড়স, মুলো, করোলা, লাউ, কুমড়ো, টমেটো সহ মরসুমি বিভিন্ন শাকের নিয়মিত যোগান মেলে এই সব্জী বাগান থেকে। শুধু তাই নয়, স্কুলের বাগানেই ফলছে আম, কাঁঠাল, কলা, লেবু, পেঁপের মত বিভিন্ন ফল।
প্রধান শিক্ষকের মতে, সামান্য রক্ষনাবেক্ষণ করলেই এই সব্জিবাগান বা পুষ্টিবাগান থেকে সারা বছর বিভিন্ন শাক -সবজির যোগান পাওয়া সম্ভব। এতে যেমন মিড -ডে মিলের খরচ বাঁচানো যাবে তেমনি শিশুর মানসিক ও দৈহিক বিকাশ ঘটাতেও সাহায্য করে। গাছের প্রতি তাদের ভালোবাসা জন্মায়,ছোট থেকেই পড়ুয়াদের মধ্যে বাগান তৈরীর অভ্যাস গড়ে উঠে । প্রকৃতির বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে তাঁরা জানতে উৎসাহী হয়। স্কুলের শিক্ষকমশাইদের সাথে স্কুলের পড়ুয়ারাও পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে সব্জিবাগানে গাছের দৈনন্দিন পরিচর্যা, গেছে জল দেওয়া, বাগান থেকে সব্জী তুলে নিয়ে আসায় সাহায্য করতে এগিয়ে আসে। গ্রামবাসীরাও কায়িক পরিশ্রম দিয়ে সাহায্য করেন।শিশুদের স্বাস্থ্যের কথা মাথায় রেখে এখানে রাসায়নিক বিষমুক্ত ফসল উৎপাদনে লিখে জৈবসার, কেঁচোসার এর ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে সাহায্য করেছে স্থানীয় কৃষিদপ্তর।
শুধুমাত্র স্কুলের সামগ্রিক উন্নতিই নয়, সাথে সাথে স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা যে সমস্ত পরিবার থেকে আসে সেই সমস্ত পরিবারগুলির আর্থিক উন্নয়নেরও দিশা দেখাচ্ছেন স্কুলের শিক্ষকেরা। তাঁদের এই উৎসাহ ও আগ্রহ দেখে সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছে আড়ষা ব্লক কৃষি দপ্তর। আড়ষা ব্লক কৃষি দপ্তরের আতমা প্রকল্পের ব্লক টেকনোলজি ম্যানেজার দীপক কুমার মাহাতো জানান- এই স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের পঠন পাঠনের পাশাপাশি কৃষির বিভিন্ন বিষয়ের হাতে কলমে কাজের মাধ্যমে পরিচয় করিয়ে দিতে শিক্ষককেরা যথেষ্ট উৎসাহী। তাই আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে বিজ্ঞান – নির্ভর চাষের বিভিন্ন বিষয়ে ছোট থেকেই এই স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের পরিচয় ঘটাতে ও এর সাথে সাথে গ্রামের দরিদ্র পরিবার গুলিকে কৃষিকাজের মাধ্যমে স্বনির্ভর করতে বিভিন্ন ভাবে সাহায্য করছে কৃষিদপ্তরের আতমা প্রকল্প। কৃষিদপ্তরব ও আতমা প্রকল্পের মাধ্যমে বিভিন্ন সবজির বীজ, প্রয়োজনীয় সার, জৈব কীটনাশক, কেঁচোসার তৈরিতে সাহায্য করা হয়, আধুনিক জলের সাশ্রয়ের জন্য ফোয়ারা সেচের ব্যবস্থা করা হয়। আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া এই গ্রামটির অধিকাংশই কৃষিজীবী পরিবার হওয়া সত্ত্বেও কৃষিকাজের বিষয়ে উৎসাহী নন। অধিকাংশ পরিবারই কৃষির সাথে যুক্ত থাকেন না। বছরের অনেকটা সময় কাজের সূত্রে জেলার বাইরে থাকেন। তাই উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে কৃষিকাজে মধ্য দিয়ে তাদের আর্থিক উন্নয়নের লক্ষ নিয়ে কাজ করছেন কাঞ্চনপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। প্রযুক্তিগত অন্যান্য সহায়তা দিয়ে সাহায্য করছে আতমা প্রকল্প।
স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের অভিভাবকদের সাথে পরামর্শ করে, স্কুলের সামনেই ১বিঘা জমি স্কুলকে দিয়েছে চাষ করতে। এই সমস্ত জমি গুলির মাটির জলধারণ ক্ষমতা খুব কম। ধানচাষও ভালোভাবে হয় না। তাই কৃষিদপ্তরের পরামর্শে বিকল্প চাষের মাধ্যমে আয়ের পথ সুগম করতে সবজির পাশাপাশি মোট ৩বিঘা জমিতে অর্থকরী ফসল হিসাবে তরমুজ ও খরবুজ চাষ করা হয়েছে। মাটির জলধারণ ক্ষমতা বাড়াতে ও জলের সশ্রয় করতে পলিমালচিং এর ব্যবহার করা হয়েছে। সমস্ত এলাকায় ৪হাজার থেকে ৫হাজার মাদাতে এক একটিতে ২টি করে মোট ৮- ১0 হাজার গাছে কমপক্ষে ১৬ হাজার ফল হলেও ৭-৮টন ফলন পাওয়া যাবে। গড়ে ২০ টাকা কেজি হিসাবে দাম পেলেও লাখ টাকার বেশী আয় হতে পারে। সমস্ত খরচ বাদ দিয়ে যে টাকা থাকবে তা স্কুলের সামগ্রিক উন্নয়নে কাজে যেমন ব্যবহার হবে, তেমনি গ্রামের কৃষকদের ও কৃষিকাজে উৎসাহিত করা যাবে। তাদের বিকল্প আয়ের একটা দিশা দেখানো যাবে।
সন্দীপ সরকার
পুরুলিয়া