Story
চুরিবিদ্যা মহাবিদ্যা যদি না পড়ো ধরা’ আপ্তবাক্যটি কেউ কেউ এতটাই সিরিয়াসলি নিয়ে নেন যে তখন আর মাথার ঠিক থাকে না। হারিয়ে ফেলেন বাস্তব জ্ঞান। মান, সম্মান তখন চুলোয় যায়। আগে তো পকেট গরম করতে হবে নাকি! কিন্তু অপরাধ অপরাধ-ই। তার ছোট, বড় কিছু হয় না। কিন্তু পৃথিবীতে এমন কিছু অপরাধীর জন্ম হয় যিনি পৃথিবীর ইতিহাসে থেকে যান চিরকাল তাঁদের অভিনব চুরিবিদ্যার জাদুতে। নাকানিচোবানি খায় পুলিশ-প্রশাসন। তেমনই একজন হলেন ভিক্টর লাস্টিগ। যিনি ছোটখাটো কোন অপরাধ করেননি। বরং বোকা বানিয়ে বিক্রি করে দিয়েছিলেন আইফেল টাওয়ার! শুনেই মাথাটা বোঁ করে ঘুরে গেল তাই তো? আজ্ঞে, ঠিকই বলছি। আইফেল টাওয়ারকেও বিক্রি করে দিতে পেরেছিলেন বিশ্ব বিখ্যাত এই কন আর্টিস্ট। কিভাবে সেটাই বলছি। তবে তার আগে আইফেল টাওয়ারের ইতিহাস ছোট্ট করে বলে দেওয়া যাক। না-হলে ভিক্টর লাস্টিগ কিভাবে বিক্রি করলেন, সেটা বুঝতে একটু অসুবিধে হবে।
আইফেল টাওয়ার- পৃথিবীর অন্যতম দর্শনীয় এবং ফ্রান্সের সবচেয়ে পরিচিত একটি স্থাপত্য। সুবিশাল এই লৌহ কাঠামোটি চেনেন না, এমন মানুষ নেই বললেই চলে। ৩২০ মিটার উঁচু এই সুবিশাল লৌহ স্থাপত্যটি তৈরি করতে সময় লেগেছিল দীর্ঘ ২ বছরের বেশি। প্রায় ৩০০ জন শ্রমিক আইফেল টাওয়ার নির্মাণে পরিশ্রম করেছিলেন দিনরাত। আর যার মাথা থেকে এই আইফেল টাওয়ারটি তৈরি হয় তিনি গুস্তাভো আইফেল। যিনি সেইসময় রেলের জন্য সেতু তৈরির নকশা করতেন। এখানেই বলে রাখি, ফরাসি বিপ্লবকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য আইফেল টাওয়ারটি তৈরি করা হয়েছিল। সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যপার হল, সেই সময় আইফেল টাওয়ার তৈরি হলে প্যারিসের মানুষজন খুব বিরক্তি প্রকাশ করেছিলেন। তাঁরা মনে করতেন, আসলে এটি নাকি শহরের সৌন্দর্যকে নষ্ট করছে। পরে অবশ্য এই আইফেল টাওয়ারকে বেতার মাধ্যমের জন্য ব্যবহার করার কথা ভাবা হয়। এখানেই বলে রাখি, স্বয়ং হিটলার নাকি আইফেল টাওয়ার গুঁড়িয়ে দেবার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু যাই হোক, তাঁর নির্দেশ অগ্রাহ্য করা হয়েছিল। আর যে কারণে আইফেল টাওয়ারটি অক্ষত থেকে যায়। কিন্তু ঘটনার সূত্রপাত অন্য একটি জায়গা থেকে। সাল ১৯২৫- একটি পত্রিকায় লেখা বেরোয় যে আইফেল টাওয়ার রক্ষণাবেক্ষণ করার জন্য যে বিপুল টাকার প্রয়োজন, সেই টাকা জোগাড় করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে ফ্রান্সের সরকার। এমনকি সেই পত্রিকায় বলা হয় যে, আদৌ এটা রেখে দেওয়া ঠিক হবে নাকি বেচে দেওয়া। সেই লেখাটিই নজরে পড়ে ভিক্টর লাস্টিগের। তারপরেই আইফেল টাওয়ারকে বিক্রি করার মত দুর্বুদ্ধি চাপে তাঁর মাথায়। এবার সেই বিষয়ে বলার আগে দু’চার কথা বলে নেওয়া যাক ভিক্টর লাস্টিগ সম্পর্কে।
পৃথিবীর ইতিহাসে যে-সকল কন আর্টিস্ট রয়েছেন, তাঁদের মধ্যে একেবারে শুরুর দিকেই নাম থাকতে পারে ভিক্টর লাস্টিগের। ইনি ১৮৯০ সালে অস্ট্রিয়ার হাঙ্গেরিতে জন্মগ্রহণ করেন। অনেকে বলেন, তাঁর বাবা নাকি ছিলেন একজন ছিঁচকে চোর, আবার অনেকে বলেন লাস্টিগের পরিবার ছিল খুবই গরিব। কিন্তু স্কুল জীবন থেকেই ভিক্টর লাস্টিগ ছাত্রদের মধ্যে নিজের ব্যবহার, চটপটে মেধা ইত্যাদির জন্য বেশ সুনাম কুড়িয়ে নিয়েছিলেন। বলা হয়, ভিক্টর লাস্টিগের চরিত্র এবং ব্যবহার এতটাই মধুর ছিল যে তার পেছনে যে এক অপরাধপ্রবণ মানসিকতা কাজ করছে সেটা ধরার মত কেউ ছিল না। মাত্র ১৯ বছর বয়সেই তিনি জুয়া খেলাতে পারদর্শী হয়ে পড়েন। স্কুল জীবন শেষ করে তিনি জড়িয়ে পড়েন অপরাধ জগতের সঙ্গে। বিভিন্ন রকম জালিয়াতি, মানুষদের সঙ্গে ভাঁওতাবাজি করে নিজেকে দারুণভাবে তুলে ধরতে লাস্টিগের ছিল জুড়ি মেলা ভার। শোনা যায়, জীবনের প্রথমদিকে তিনি নিজেকে সঙ্গীত প্রযোজক হিসেবে তুলে ধরতে শুরু করেন। ফ্রান্সের আটলান্টিক বন্দর থেকে নিউইয়র্ক পর্যন্ত যে জাহাজ চলাচল করত, সেখানে ধনী মানুষদের ভুলিয়ে ভালিয়ে প্রযোজনা সংস্থার জন্য টাকা ঢালতে বলতেন, আসলে যে সংস্থার কোন অস্তিত্বই ছিল না। শোনা যায় ১৯২২ সালে তিনি একটি ব্যাঙ্ক জালিয়াতি করেছিলেন। তারপর টাকা এবং বন্ড- এই দুই নিয়েই একেবারে ধাঁ হয়ে যান আমেরিকা থেকে। এবং পালিয়ে আসেন ফ্রান্সে।
যার মাথায় দুর্বুদ্ধি সবসময় ঘোরাফেরা করছে, সে সবসময়ই খুঁজে বেরাবে রাস্তা। এমনই একটি সময়ে তাঁর নজরে পড়ে ১৯২৫ সালে একটি ম্যাগাজিনে প্রকাশিত আইফেল টাওয়ার নিয়ে প্রতিবেদনটি। ব্যস, দুর্বুদ্ধি কাজ করতে শুরু করল। অচিরেই ঠিক করে ফেললেন তিনি বোকা বানিয়ে আইফেল টাওয়ারটি বিক্রি করে দেবেন। সেই সময় আইফেল টাওয়ারের লৌহ স্তম্ভে জং ধরতে শুরু করেছিল। এমনকি রংটাও ফ্যাকাশে হতে শুরু করে। তাই ভিক্টর লাস্টিগ ঠিক করেন, আইফেল টাওয়ার বিক্রি করবেন খুব সাবধানে। তার জন্য ফ্রান্সের একটি অভিজাত হোটেলে একটি বৈঠক সারেন লাস্টিগ। বৈঠকটি করা হয় কিছু লোহা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে। তিনি নিজেকে ঐ ব্যবসায়ীদের কাছে ডাক এবং টেলিগ্রাফ মন্ত্রকের মহা-পরিচালক হিসেবে পরিচয় দেন এবং বিশ্বাস কুড়িয়ে নিতেও সক্ষম হন। ফ্রান্সের সরকার যে আইফেল টাওয়ারটি ভেঙে ফেলতে চাইছে, সে বিষয়েও বিস্তারিত জানান। একইসঙ্গে বলেন, কাজটি শেষ না-হওয়া পর্যন্ত কোথাও বিস্তারিত বলা যাবে না। আইফেল টাওয়ারকে কার কাছে বিক্রি করা যেতে পারে, সেটা খুব সাবধানে নির্বাচন করতে চেয়েছিলেন তিনি। আর তখনই লাস্টিগের নজরে পড়েন আন্দ্রে পয়সন নামের এক ব্যক্তি। যিনি নিজেকে ব্যবসায়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছিলেন। বলাই বাহুল্য, পয়সন লাস্টিগের টোপটি গিলে ফেলেন। এরপর একটি ব্যক্তিগত বৈঠক সারেন লাস্টিগ-পয়সনের সঙ্গে। সেখানেই লাস্টিগ বলেন যে তিনি একজন দুর্নীতিতে জর্জরিত এক সরকারি কর্মকর্তা। এদিকে দেশের অন্যান্য মুখ্য ব্যবসায়ীরা যাতে আইফেল টাওয়ারটি কিনে না-নেন তার জন্য লাস্টিগকে মোটা অঙ্কের ঘুষ দিতে রাজি হয়ে যান আন্দ্রে পয়সন। প্রায় ৭০ হাজার ফ্রাঙ্কের বিনিময়ে গোটা চুক্তিটি সারেন। বলাই বাহুল্য, সেই টাকা নিয়ে সটান ফ্রান্স থেকে অস্ট্রিয়ায় পালিয়ে যান ভিক্টর লাস্টিগ।
লাস্টিগ নিশ্চিত ছিলেন যে, পয়সন এমনই এক লজ্জাজনক বিষয়ের শিকার হয়েছেন যে, পয়সন কোনদিন আইফেল টাওয়ার কিনে নেওয়ার মত বিষয়টি জনসমক্ষে বলতে পারবেন না। তবে ঐ- কথায় বলে, কানা মনে-মনে জানা। তিনি অস্ট্রিয়া থেকে সমানে নজর রাখছিলেন সংবাদপত্রের দিকে। এবং অদ্ভুতভাবে লাস্টিগ নিশ্চিত হন যে, প্যারিসের কেউ এই বিষয়টি সম্পর্কে জানতেই পারেনি। ফলে দুর্বুদ্ধি ফের বাসা বাঁধে। তিনি ঠিক করেন, দ্বিতীয়বারের জন্য আইফেল টাওয়ার বিক্রি করবেন। ফিরে আসেন প্যারিসে। তারপর ছোট একটি ব্যবসায়ীর দলকে আগের মতন করেই আইফেল টাওয়ার বিক্রির পরিকল্পনা তুলে ধরেছিলেন। অবশ্য শেষ পর্যন্ত আর তাঁর সকল পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে যায়। পুলিশের হাতে ধরা পড়তে হবে, এই ভয়ে পালিয়ে যান আমেরিকায়।
ভিক্টর লাস্টিগকে বলা হয় পৃথিবীর অন্যতম কন আর্টিস্ট। যিনি নিজের দুর্বুদ্ধি এবং চতুরতাকে আশ্রয় করে আইফেল টাওয়ার বিক্রি করার মত সাহস দেখাতে পেরেছিলেন। ৪৭টি ছদ্মনাম নিয়েছিলেন তিনি। ছিল অনেক দেশের পাসপোর্ট। তাঁর আকর্ষণীয় উপস্থিতি তাঁকে সহজেই অন্যের কাছে খুব অভিজাত ব্যক্তি হিসেবে দাঁড় করাতে পারত। আর সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ছিলেন তিনি। তাহলে জানলেন আইফেল টাওয়ার বিক্রির এই ইতিহাস! প্রতিবেদনটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন, এবং এমনই আরও ইন্টারেস্টিং প্রতিবেদন জানতে হলে অবশ্যই সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের চ্যানেল বিজনেস প্রাইম নিউজ।
জীবন হোক অর্থবহ