Story

দেখলে প্রথম ধাক্কায় মনে হতে পারে টুথপেস্ট বা টিউববন্দি প্রসাধন সামগ্রী। কিন্তু চমক সেখানেই। পেস্ট বা প্রসাধন সামগ্রী নয়। টিউবের মধ্যে রয়েছে একেবারে খাঁটি নলেন গুড়! হ্যাঁ। মাটির ভাঁড়ে গুড় বিক্রির মত সনাতনী প্রথা ভেঙে এখন টিউবের মধ্যেই পাওয়া যাচ্ছে নলেন গুড়। যা স্বাদে, গন্ধে অতুলনীয়।
নদীয়ার কৃষ্ণগঞ্জ ব্লকের মাজদিয়ার খেজুর গুড়ের বাজার সুপ্রাচীন। এখানেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে বহু খেজুর গাছ। আশ্বিন মাস পড়লেই শিউলিরা নেমে পড়েন খেজুর রস সংগ্রহ করার জন্য। এই কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকেন দেড়-দু হাজার শিউলি। কিন্তু শিউলির সংখ্যা ক্রমশ কমতে থাকায় নলেন গুড়ের ব্যবসার ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয় অনিশ্চয়তা। তাই নলেন গুড়ের ব্যবসাকে টিকিয়ে রাখতে আসরে নামেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই। উচ্চমানের প্রযুক্তি এবং উচ্চ কারিগরিবিদ্যার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন তিনি। অবশেষে তাঁরই আহ্বানে ভাজনঘাটে হাজির হয় পশ্চিমবঙ্গ খাদি ও গ্রামীণ শিল্প পর্ষদ। শ্রীকৃষ্ণ নলেন গুড় উৎপাদক সমিতির সঙ্গে মৌ স্বাক্ষর করে তারা। তৈরি হয় উন্নতমানের অত্যাধুনিক কারখানা। শুরু হয় পথ চলা। প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৪০০ জন শিউলির কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয় খেজুরের রস। কাঠের আগুনে জ্বাল দিয়ে তৈরি করা হয় নলেন গুড়। গুনমান যাচাই করার জন্য পরীক্ষা করা হয় ল্যাবরেটরিতে।
এই কর্মকাণ্ডের জন্য আখেরে উপকৃত হচ্ছেন শিউলিরাই। আগে কঠোর পরিশ্রম করে যারা রস সংগ্রহ করে বাড়িতেই জ্বাল দিয়ে গুড় তৈরি করেন। তারপর মাটির ভাঁড়ে সেই গুড় ভর্তি করে প্রথামত নিয়ে আসেন মাজদিয়ার হাটে। এতো পরিশ্রমের পরেও তাঁরা সেভাবে দেখতে পেতেন না লাভের মুখ। কিন্তু এখন খেজুর রস সংগ্রহ করে নিয়ে আসতে পারলেই পেয়ে যাচ্ছেন সঠিক দাম। নেই অতিরিক্ত কোন খাটুনি। সবমিলিয়ে খুশি এলাকার শিউলিরা।
১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ সালে এই উদ্যোগটির উদ্বোধন করেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শুরুতে ধীর পায়ে পথচলা শুরু হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এখন টিউববন্দি নলেন গুড়ের ব্যবসা অনেকটাই বেড়েছে। তার অন্যতম কারণ চাহিদা। চাহিদা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে বলেই ব্যস্ততাও বেড়েছে অনেকটা।
টিউববন্দি অবস্থায় এই নলেন গুড় থাকতে পারে দীর্ঘ ছয় থেকে আট মাস। টিউব বন্দি নলেন গুড় প্রথমে সরবরাহ করা হয় খাদি ও গ্রামীণ শিল্প পর্ষদে। বিক্রি হয় বিশ্ব বাংলা, খাদি পর্ষদ এবং বাঞ্ছারাম ব্র্যান্ডের উদ্যোগে। আর শুধু বাংলাতেই নয়। টিউব বন্দি গুড় পাড়ি দিচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ও বড় বড় জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক মেলায়। এভাবেই যদি আরো উদ্যোগী এগিয়ে আসে তবে তাঁরাও দাঁড়াতে পারবেন শিউলিদের পাশে। একইসঙ্গে তৈরি হবে ভালো কর্মসংস্থানের সুযোগ। আর খাদ্যরসিকরাও হাতে পেয়ে যাবেন টিউব বন্দি নলেন গুড়।
সুব্রত সরকার
নদীয়া