Story
মাকুর খটখট আওয়াজ যেন ওই মানুষগুলোর ছাপোষা জীবনের ছন্দ লিখে চলেছে রোজ। এই প্রতিটা সুতোয় মিশে আছে অসংখ্য শ্রমজীবী মানুষের জীবনগাঁথা। নীলাম্বরী, গঙ্গা-যমুনা, রাজমহল, চাঁদমালা-নদীয়া জেলার ঐতিহ্য-আভিজাত্যে মোড়া তাঁতশিল্পের রঙিন গল্পগাঁথা। আর যারা এই গল্পের নায়ক? তাদের জীবনের রংটা আদৌ রঙিন তো?
‘নদী চর খাল-বিল গজারীর বন/ টাঙাইল শাড়ি তার গরবের ধন’- ৪৭-এ দেশভাগ। আর তারপরই একে একে ওপার বাংলা থেকে এপারে চলে আসেন একদল টাঙাইল তাঁতযোদ্ধা। শান্তিপুর আর ফুলিয়া হল তাদের নতুন ঠিকানা। শুরু হল নতুন করে স্বপ্নবুনন। আজ ন্যাশনাল হ্যান্ডলুম ডে-তে বাংলার তাঁতশিল্প নিয়ে কথা বলতে গেলে যাদের নাম না করলেই নয়। রাষ্ট্রের কোনরকম হস্তক্ষেপ ছাড়া, কোন সরকারী অনুদান ছাড়া কীভাবে একটা উদবাস্তু পুনর্বাসন গড়ে উঠলো, তার একটা বড় উদাহরণ এই ফুলিয়া।
পশ্চিমবঙ্গে কৃষিকাজের পর সবচেয়ে বেশি এমপ্লয়মেন্ট জেনারেট করে এই সেক্টর। আজ সেই শিল্পের আড়ালে লুকিয়ে থাকা আসল নায়কদের নিয়ে কথা হোক। দিনরাত তাঁত বোনা যেন পৃথিবীর আলো আঁধারের জাল বোনা। দেশভাগের এতগুলো বছর পরেও দুই বাংলাকে জুড়ে রেখেছে এই তাঁতশিল্প- বাংলার ঐতিহ্য, বাংলার ইতিহাস। বিজ্ঞাপনের পৃথিবী থেকে শত যোজন দূরে থেকে যে হাতগুলো এক একটা মাস্টারপিস তৈরি করে, বাংলার ঐতিহ্যকে পৌঁছে দেয় র্যাম্প থেকে রেড কার্পেটে, কেমন আছে তারা আজ?
ট্র্যাজেডি ছাড়া গল্প হয়? বাংলার কুটির শিল্পের সঙ্গে যন্ত্র শিল্পের যেন এক অঘোষিত দ্বন্দ্ব বেঁধে রয়েছে গোটা ফুলিয়া জুড়ে। হ্যান্ডলুমের পর পাওয়ার লুম। তারপর এল ডিজিটাল লুম। মান্ধাতার আমলের তাঁতিরা কোথায় যাবেন? গোদের ওপর বিষফোঁড়ার আবার সুরাট বা বাংলাদেশের থেকে আসা চোরা কাপড়। যার মান অত্যন্ত খারাপ হওয়া সত্ত্বেও কম দামের কারণে বাজারে বাড়ছে চাহিদা। আধুনিকতার যে কালো ছায়া এই শিল্পকে গ্রাস করছে, তাতে খুব বেশিদিন টিকে থাকা বেশ কঠিন। জীবন যায় যাক, ট্র্যাডিশন টিকে থাক। তাই দাঁতে দাঁত চেপে হলেও লড়াই জারি রেখেছেন এই যোদ্ধারা।
টিকে থাকার লড়াই সেখানে আরও কঠিন। রয়েছে মহাজনদের দাপটও। নতুন প্রজন্মের কেউই আর এই শিল্পকে এগিয়ে নিয়ে চলার স্পর্ধা দেখাচ্ছেন না। তবে আরও একটা বিষয়। বহু সমস্যা থাকলেও গোষ্ঠী ও সমবায়ই যে দরিদ্র তাঁতিদের মহাজনের হাতে শোষণ বন্ধের একমাত্র পথ, সে বিষয়ে প্রশ্ন নেই, গবেষণা অন্তত সে কথাই বলে। মঞ্জুষা, তন্তুজ, বিশ্ব-বাংলা যদি লাভের মুখ দেখে তা হলে আর একটু চেষ্টা করলে নিশ্চয়ই বাংলার তাঁতও তাঁতি বাঁচবে।
শেষ করার মুহূর্তে বিখ্যাত সেই প্রবাদটা মনে পড়ল। ‘মদন যখন গামছা বুনবে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর লেখনীতে বলেছেন – খালের ধারে, নদীর ধারে, গ্রামচাষি, মাঝি, জেলে, তাঁতিদের পীড়িত ক্লিষ্ট মুখ দেখতেন তিনি অহরহ আর ‘মধ্যবিত্ত আর চাষাভুষোর ওই মুখগুলো শুধু বলত, ভাষা দাও। সেই ভাষাই তিনি দিয়েছিলেন শিল্পী মদনের মুখে। যে অনায়াসে তাঁতি সমাজের আপোষহীন শ্রেণীসংগ্রামের নায়ক হয়ে ওঠে। সেই অনমনীয়তা থেকে সে নিচুতলার প্রতিবাদী কন্ঠস্বরের ধারক হয়েই বলে বড়ো বাড় বেড়েছে বাবুদের। এ প্রতিবাদ সমস্ত শ্রেণীসংগ্রামী মানুষের প্রতিবাদ। এখন প্রশ্ন হলো, এ যুগে কি কোনও মদন তাঁতি নেই, যে শিল্পসত্ত্বা টিকিয়ে রাখতে সামাজিক উত্তরণ তথা জন-জাগরণের ডাক দেবে?
সুব্রত সরকার
নদীয়া