Tourism
দক্ষিণ আফ্রিকা- আফ্রিকা মহাদেশের সবথেকে সমৃদ্ধ একটি দেশ। জল, জঙ্গল এবং পাহাড় পর্বতের সঙ্গে আধুনিকতার মিশেল ঘটেছে এই দেশে। ভূ-প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যে ভরপুর দক্ষিণ আফ্রিকা সবদিক থেকেই যেন পর্যটকদের কাছে রয়েছে হট লিস্টে। কেপটাউন, জোহানেসবার্গ, ডারবানের মত শহরের পাশাপাশি ক্রুগার ন্যাশনাল পার্ক বা টেবল মাউন্টেনের মত প্রাকৃতিক দৃশ্যগুলি পর্যটকদের মন আটকে রেখে দেবার জন্য যথেষ্ট। তাই প্রতি বছর ভারত থেকে তো বটেই, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকরা হাজির হন এখানে। শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি এবং আফ্রিকার অন্যান্য দেশের মতন এই দেশেও পর্যটন খাত দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখতে সাহায্য করে। তাই দক্ষিণ আফ্রিকার সরকার ভারতীয় পর্যটকদের আরও বেশি করে এই দেশ ঘোরানোর জন্য সচেতন হয়ে পড়েছে। সে দেশের সরকার মনে করে, ভারতীয় পর্যটকদের সংখ্যা বছর বছর বৃদ্ধি পাচ্ছে। একটি সূত্র বলছে, অতিমারির বছ পেরিয়ে সাউথ আফ্রিকায় ২০২২ সালে ৫০ হাজারের মত ভারতীয় ঘুরতে এসেছিলেন। যা কিছুটা হলেও দক্ষিণ আফ্রিকার গভর্নমেন্টের কাছে কিছুটা অপ্রত্যাশিত ছিল। তাই ভারতীয়রা যাতে আরও বেশি করে ঘুরে আসতে পারেন, তার জন্যই দক্ষিণ আফ্রিকার পর্যটন সেক্টরের আধিকারিক ভারতের মেট্রো শহরগুলিতে রোড শো-এর আয়োজন করে। এবার আসা যাক প্রশ্নে, যার ব্যাখ্যা দেব এই প্রতিবেদনেই। দক্ষিণ আফ্রিকার সরকার হঠাৎ করেই ভারতীয় পর্যটকদের আসা নিয়ে কেন উঠেপড়ে লাগল? আর দ্বিতীয় হচ্ছে দক্ষিণ আফ্রিকায় এমন কোন জায়গা রয়েছে যা একেবারেই মিস করা যাবে না? আসুন সেটাই বলা যাক পরপর।
আফ্রিকা মহাদেশের একেবারে দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত এই দেশটিকে ঘিরে রেখেছে আটলান্টিক মহাসাগর এবং ভারত মহাসাগর। দক্ষিণ আফ্রিকার তটরেখার দৈর্ঘ্য প্রায় ২৮০০ কিমি মতন। নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়ার এই দেশটিকে মূলত তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়। দক্ষিণ আফ্রিকায় রয়েছে মালভূমি, নিম্ন সমভূমি এবং পার্বত্য অঞ্চল। এছাড়াও এই দেশের পশ্চিমে রয়েছে কালাহারি মরুভূমি এবং নামিব মরুভূমি। আফ্রিকার অন্যান্য দেশের তুলনায় এই দেশে অরণ্যের পরিমাণ বেশ কম। স্বল্প পরিসরে অরণ্য থাকলেও দেখা মেলে সিংহ, গণ্ডার, হাতি, চিতাবাঘ, জলহস্তি এবং কৃষ্ণসার হরিণের। খ্রিস্টান ধর্ম এই দেশে সর্বাধিক থাকলেও ইসলাম, হিন্দু এবং আফ্রিকার কিছু সাবেকি ধর্ম রয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় যে যে খনিজগুলো সবথেকে বেশি পাওয়া যায় সেগুলো হল, সোনা, প্ল্যাটিনাম এবং ক্রোমিয়াম। এছাড়াও এই দেশে প্রচুর পরিমাণে হীরে এবং কয়লা খনন করা হয়। দক্ষিণ আফ্রিকায় যন্ত্রপাতি, লোহা বা ইস্পাতজাত কারখানা, কার ম্যানুফ্যাকচারিং ইন্ডাস্ট্রি সহ বিভিন্ন পণ্য এখানে প্রস্তুত করা হয়। এছাড়াও কৃষিজাত ফসলের মধ্যে ভুট্টা, গম, আখ বা কমলা লেবুর মতন ফসলের উৎপাদন এখানে ভালো হয়। এই দেশটিতে ইংলিশ, জুলু সহ ১১-টি ভাষার প্রচলন রয়েছে এখানে। এই দেশের মুদ্রার নাম দক্ষিণ আফ্রিকান র্যান্ড। তবে যত যাই হোক, এই দেশকে সবথেকে বেশি আর্থিকভাবে সচল রেখেছে ট্যুরিজম সেক্টর। পর্যটন খাতের হাত ধরেই দক্ষিণ আফ্রিকার অর্থনীতির চাকা সচল রয়েছে। তাই আজ দেখা নেয়া যাক দক্ষিণ আফ্রিকার সবচেয়ে বিখ্যাত টুরিস্ট স্পটগুলো সম্পর্কে।
১। Sabi Sand Game Reserve:
দক্ষিণ আফ্রিকার অন্যতম ন্যাশনাল পার্ক ক্রুগার ন্যাশনাল পার্কের গায়েই অবস্থিত সাবি স্যান্ড গেম রিজার্ভ। এই ন্যাশনাল পার্কে সিংহ, হাতি, লেপার্ড, জিরাফকে খুব কাছাকাছি দেখতে পাওয়া যায়। এই ন্যাশনাল পার্কের মধ্য দিয়ে বয়ে চলেছে নদী। এই ন্যাশনাল পার্কে এলে ৪৫ প্রজাতির মাছ, ৫০০ প্রজাতির পাখি, ১৪৫ প্রজাতির প্রাণী, এবং ১১০ প্রজাতির সরীসৃপ খুব কাছ থেকে দেখতে পাবেন আপনারা।
২। Lion’s Head:
যারা পাহাড় চড়তে ভালোবাসেন, সেই সকল হাইকারদের জন্য লায়ন’স হেড অতুলনীয়। এই পাহাড়ে হাইক করা বেশ কঠিন। তবে হাইক করে উঠতে পারলে এখান থেকেই দেখা মিলবে কেপ টাউন শহরের। যেন মনে হবে পুরোটাই ছবি। লায়ন’স হেড থেকে দিগন্তে নেমে আসা সূর্যাস্তের দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করার সাক্ষী থাকতে পারবেন আপনি। লায়ন’স হেডে ওঠার প্রত্যেকটি ধাপ আপনার ট্র্যাভেল এক্সপেরিয়েন্সকে আরও ভালো করে আপনার স্মৃতিতে আটকে রাখবে। কখনো মেঘ তো কখনো পরিষ্কার। এভাবেই আপনাকে স্বাগত জানাবে লায়ন’স হেড।
৩। Castle of Good Hope:
দক্ষিণ আফ্রিকার অন্যতম পুরনো বিল্ডিং হল ক্যাসল অফ গুড হোপ। ৩৬০ বছরের ইতিহাস এখানে যত্নের সঙ্গে সংরক্ষিত করা আছে। দক্ষিণ আফ্রিকা যেদিন থেকে কলোনাইজড হয়, তার যাবতীয় তথ্য ক্যাসল অফ গুড হোপে আপনি দেখতে পাবেন। এখানে এলে বুঝতে পারবেন, ১৭-শ শতকের দক্ষিণ আফ্রিকার ইতিহাসের খোঁজ আপনি পাবেন এই ক্যাসল অফ গুড হোপ থেকেই। তাই দক্ষিণ আফ্রিকায় এলে ক্যাসল অফ গুড হোপে একবার ঘুরে আসতেই হবে আপনাদের।
৪। Table Mountain:
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার ফুট উঁচুতে অবস্থিত টেবল মাউন্টেন। এখানে পর্বতের মাথাটা টেবিলের মতন সমতল বলেই এমন নাম দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে টেবল মাউন্টেন বিশ্বের সপ্তম আশ্চর্যের একটি বিস্ময়। সাধারণত টেবল টপ মাউন্টেন থেকে কেপ টাউন শহরকে একেবারে ছবির মতন দেখায়। এখানে দু’ভাবেই হাইকিং করা যায়। এক কেবলকারে এবং দুই পায়ে হেঁটে। প্রায় ৮ হাজার ২০০ প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে এখানে।
৫। Kruger National Park:
ক্রুগার ন্যাশনাল পার্ক- বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ন্যাশনাল পার্ক। যেখানে এলে প্রকৃতির এবং অরণ্যের একেবারে কাছাকাছি চলে আসতে পারবেন। এই ন্যাশনাল পার্কে এলে আপনার নিশ্চিত দেখা মিলবে বন্য প্রাণীর। এখানে এলে দেখা মিলবেই আফ্রিকার বিগ ফাইভের। বিগ ফাইভ অর্থাৎ আফ্রিকার হাতি, সিংহ, আফ্রিকান বাফেলো, গণ্ডার এবং আফ্রিকান লেপার্ডের। ক্রুগার ন্যাশনাল পার্ক এতটাই মেনটেন্ড যে এখানে বন্য জন্তুরা খুব নিশ্চিন্তে ঘুরে বেরাতে পারে। তাদের সঙ্গে দেখা করতে গেলে তাই এই ন্যাশনাল পার্কে সাফারি মাস্ট।
দক্ষিণ আফ্রিকা এমনই একটি দেশ, যে দেশের কোণায় কোণায় ছড়িয়ে রয়েছে ট্যুরিজম। অসাধারণ ভূ-প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য যে দেশের পরতে পরতে ছড়িয়ে রয়েছে, সেই দেশের ট্যুরিজম নিয়ে বহু কথা বলতে হয়। সেখানে আমরা বললাম মাত্র ৫টি। আফ্রিকার এই দেশটিতে পর্যটকদের পা পড়ে সবসময়। ২০২১ সালের একটি হিসেব থেকে জানা গিয়েছে, শুধুমাত্র পর্যটন খাত থেকেই দক্ষিণ আফ্রিকার আয় দাঁড়িয়েছিল ১৩.২ বিলিয়ন ডলারে। যার মধ্যে অনেকটাই কন্ট্রিবিউশন রয়েছে ভারতীয়দের। তাই দক্ষিণ আফ্রিকার পর্যটন বিভাগের মাথারা চাইছে, আরও বেশি করে ভারতীয়রা আসুক এই দেশে। সাক্ষী থাকুক আফ্রিকার ওয়াইল্ড লাইফ, আফ্রিকার প্রকৃতির সঙ্গে। দক্ষিণ আফ্রিকা সম্পর্কে আরও অজানা তথ্য রয়েছে। আপনারা কি সেগুলো জানতে চান? তাহলে আরেকটা প্রতিবেদনের মাধ্যমে আমরা তুলে ধরতে পারি। আপাতত বিদায় জানাচ্ছি এখন।
বিজনেস প্রাইম নিউজ।
জীবন হোক অর্থবহ