Story
অর্থনৈতিক সংকটে জেরবার শ্রীলঙ্কা। মানুষের হাতে টাকা নেই, সরকারের পথ দেখানোর রাস্তাটাও একেবারে বন্ধ। শ্রীলঙ্কার এই সংকট বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ ইকোনমিক ক্রাইসিস হিসেবে ধরাই যায়। তবে শুধু শ্রীলঙ্কা বলেই নয়। কয়েক বছর আগে এমনই অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়েছিল বিশ্বের প্রথম সারির একটি দেশ- গ্রীস। গ্রীসবাসির প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়েছিল গোটা পৃথিবীতে। যাই হোক, এই বছর এপ্রিল মাসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী দেশের তাবড় ব্যুরোক্র্যাটস বা আমলাদের সঙ্গে একটি মিটিং করেন। আর সেখানেই উঠে আসে চমকে দেওয়ার মত তথ্য। যেখানে বলা হয় অর্থনৈতিক সংকট যেমন শ্রীলঙ্কায় ভয়াবহ চেহারা নিয়েছে, একইভাবে অর্থনৈতিক সংকটের আঁচ এসে লাগতে পারে দেশের কয়েকটি রাজ্যে। তার মধ্যে রয়েছে পাঞ্জাব, উত্তরপ্রদেশ, অন্ধ্রপ্রদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গ। হ্যাঁ, ব্যুরোক্র্যাটসরা মনে করছেন, এই চারটি রাজ্য যদি ভারতের মধ্যে না থাকত, তাহলে এদের অবস্থাও দাঁড়াত শ্রীলঙ্কা বা গ্রীসের মতন। কেন?
শ্রীলঙ্কা বেশ কয়েক বছর ধরেই এফডিআই নিজের দেশে আনার চেষ্টা করছিল। কিন্তু শ্রীলঙ্কার এই চেষ্টা একেবারেই ব্যর্থ হয়। একইসঙ্গে রফতানিতেও শ্রীলঙ্কা ভালোরকম ধাক্কা খায়। কারণ শ্রীলঙ্কায় রফতানি করার মতন পণ্যের যথেষ্ট অভাব ছিল। এই পরিস্থিতিতে শ্রীলঙ্কা বাইরে থেকে স্বল্প মেয়াদি ধার পায়। যদিও তার মাধ্যমে শ্রীলঙ্কার সরকার ঠিকঠাকভাবে রেভিনিউ জেনারেট করার পরিকল্পনা নিতে ব্যর্থ হয়। বরং তারা জোর দেয় কল্যাণ প্রকল্পে। এই পরিস্থিতিতে ২০২১ সালে শ্রীলঙ্কার ধারের অঙ্কটা পৌঁছে গিয়েছিল ৩৫ বিলিয়ন ডলারে। শ্রীলঙ্কার ডেট টু জিডিপি রেশিও ছাড়িয়ে যায় ১১০% এর উপরে। মনে করা হয়, কোন দেশের ডেট টু জিডিপি রেশিও যদি ৬০% এর উপরে চলে যায়, তাহলে সেই দেশের আর্থিক স্থিতাবস্থা অনেকটাই নড়বড়ে হয়ে যেতে পারে। তবে শুধু শ্রীলঙ্কা নয়। আমাদের আরও দুই প্রতিবেশী দেশ নেপাল এবং পাকিস্তানের অবস্থাও একইরকম হতে চলেছে। পাকিস্তানে সেইভাবে কোন উন্নয়নমূলক কর্মসূচি নেওয়া হয় না। ওদিকে নেপালে আমদানির অঙ্ক দিনদিন বাড়তে শুরু করায় তারাও যে আর্থিক সংকটের মুখোমুখি পড়তে পারে, সে কথা মেনে নিচ্ছেন অনেক বিশেষজ্ঞরাই। কিন্তু আমাদের দেশের রাজ্যগুলোর অবস্থা এমন কেন?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই রাজ্যগুলিকেও আর্থিক সংকটের মুখোমুখি হতে হবে, তার অন্যতম কারণ ফ্রিবিজ এবং বিভিন্ন জনপ্রিয় প্রকল্প। এমনিতেই রাজ্যগুলির আর্থিক স্থিতিশীলতা বেশ টলমল। তার কারণ রাজ্যগুলির ট্যাক্স থেকে উপার্জিত অর্থের পরিমাণ বেশ কমে যাওয়ায় বাড়তে শুরু করে ধার। বেঙ্গালুরুর বি আর অম্বেদকর স্কুল অফ ইউনিভার্সিটির ভাইস চ্যান্সেলর এন আর ভানুমূর্তি জানিয়েছেন চোদ্দতম ফিনান্স কমিশন রাজ্যগুলিকে উন্নয়ন খাতে কাজ করার পরামর্শ দিলেও দেখা যায় রাজ্যগুলি উন্নয়নের বদলে বিভিন্ন জনপ্রিয় স্কিমে টাকা খরচ করতে শুরু করে। আর যে কারণে ডেট টু জিএসডিপি রেশিও অনেকটাই বাড়তে শুরু করে দেয়। জিএসডিপি অর্থাৎ গ্রস স্টেট ডোমেস্টিক প্রোডাক্ট। আমরা সবাই জানি, সিএজি রাজ্যের অর্থনৈতিক অবস্থার দিকে নজর রাখে। তাদের সমীক্ষাই জানাচ্ছে যে, কয়েকটি রাজ্যের ইন্টারেস্ট পেমেন্ট তাদের আয়ের থেকে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে শুরু করে।
পাঞ্জাব এবং উত্তরপ্রদেশ নির্বাচনের পর সেখানে বেশ কিছু জনপ্রিয় প্রকল্প চালু হয়। যেমন পাঞ্জাবে আম আদমি পার্টি ঘোষণা করে প্রতি মাসে ৩০০ ইউনিট ইলেক্ট্রিসিটির কথা। একইসঙ্গে জানায় প্রতিটি মহিলাকে মাসে হাজার টাকা দেওয়া হবে। এর জন্য খরচ হবে আলাদা করে ২০ হাজার কোটি টাকা। এই স্কিম তখনই চালু করা হচ্ছে, যখন আউটস্ট্যান্ডিং ডেট পাঞ্জাবে ৫ বছরে পৌঁছে গিয়েছে ২.৮২ লক্ষ কোটি টাকা। পাঞ্জাবের ডেট টু জিডিপি রেশিও বেড়ে গিয়েছে ৫৩% এর উপরে। সাধারণত কোন একটি রাজ্যের আর্থিক স্বাস্থ্য সবচেয়ে ভালো থাকে যখন লিমিট থাকে ২০%। উত্তরপ্রদেশে বিজেপি আসার পর বিনামূল্যে এলপিজি সিলিন্ডার দেওয়ার কথা জানায়। অন্ধ্রপ্রদেশও আউটস্ট্যান্ডিং ডেট পৌঁছে গিয়েছে ৩.৮৯ লক্ষ কোটি টাকা। ডেট টু জিএসডিপি রেশিও বেড়ে গিয়েছে ৩২.৪ শতাংশ। এরপর আসি বাংলায়। এখানেও সরকার বিভিন্ন জনপ্রিয় স্কিম চালু করেছে। যার মধ্যে অন্যতম কৃষক বন্ধু প্রকল্প। আর শুধু এই প্রকল্পেই ডেট টু জিএসডিপি রেশিও দাঁড়িয়েছে ৩৮.৮ শতাংশ। দেশের শীর্ষ ব্যাঙ্ক রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া জানিয়েছে, দেশের ১৮টি রাজ্যের ডেট টু জিএসডিপি পৌঁছে গিয়েছে ৩১.২ শতাংশ। ১০ বছর আগে এই রেশিও ছিল ২২.৬ শতাংশ। তাই আরবিআই ইতিমধ্যেই রাজ্যগুলিকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবার পরামর্শ দিয়েছে। তবে রাজ্যগুলি আর্থিকভাবে ধাক্কা খেয়েছে অতিমারির সময়। যে কারণে বেশ কিছু রাজ্যের ডেট বারডেন ১৫ বছরে সর্বোচ্চ হয়েছে। অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন, সেন্ট্রাল এবং স্টেট গভর্নমেন্টের যৌথ প্রচেষ্টায় ফেডেরাল কো-অপারেশন তৈরি করা যা বিশেষ কিছু প্রকল্প তৈরি করবে সাধারণ মানুষের জন্য। এমনকি ডেট টু জিএসডিপি রেশিও কমানোর জন্য স্টেট স্পেসিফিক পলিসি নিয়ে আসা। আর এতো বড় দেশের এতগুলো রাজ্য। যাদের রাজনৈতিক পলিসি আলাদা। তাই রাজ্য বিশেষে এই পলিসি নিতে হবে। যাতে মানুষের উপরে কোন বাড়তি চাপ না পড়ে।
বিজনেস প্রাইম নিউজ
জীবন হোক অর্থবহ