Story
অনাদরে অবহেলার আনাজ লঙ্কা। আর সেই লঙ্কা চাষেই লাভের মুখ দেখছেন পুরুলিয়ার কৃষকরা। রুখা শুখা জমিতে পরিশ্রমের ফসলে বেশ কয়েকশো চাষির ঘরে আজ বইছে সুখের হাসি।
নিত্য প্রয়োজনীয় সবজির অন্যতম হল কাঁচা লঙ্কা। আর সেই কাঁচা লঙ্কা কাঁচা থাকতেই ঘটত পোকামাকড়ের আক্রমণ। সেই লঙ্কায় মানুষ না কামড় দিলেও কৃষকের চোখে পোকার ঝাঁঝে বইত অঝোরধারা। এইসবই এখন অতীত। অন্তত পুরুলিয়া জেলাতে। লঙ্কাচাষিদের মুখে হাসি ফোটাতে এগিয়ে এলো আড়ষা ব্লকের কৃষি দপ্তর।
জেলার পিছিয়ে পড়া ব্লকগুলির অন্যতম হল এই আড়ষা। সেই আড়ষাই মূলত যোগাত গোটা জেলার সবজির বাজারগুলিতে কাঁচা লঙ্কার চাহিদা। প্রচলিত পদ্ধতিতে আগে এখানকার কৃষকরা এই সবজির চাষ করতেন। সেই চাষ ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। রোগ পোকার আক্রমণে বিঘার পর বিঘা জমিতে এই সবজির চাষ হলেও লাভের মুখ দেখা ছিল লটারিতে পুরস্কার পাওয়ার মতই। কারুর ভাগ্যে জুটত হাসি। কারুর ভাগ্যে জুটত একরাশ হতাশা আর অদৃষ্টকে দোষারোপ করা।
পরিবর্তনটা আসে বিগত কয়েক বছর ধরে। আর পরিবর্তন নিয়ে আসেন আড়ষা ব্লকের আতমা প্রকল্পের ব্লক টেকনোলজি ম্যানেজার দীপক কুমার মাহাতো। একেবারে কৃষকদের সঙ্গে ক্ষেতে নেমে ক্ষেত প্রস্তুত করে পলিমালচিং পদ্ধতি ব্যবহার করে আর হ্যান্ড শাওয়ারের সহযোগিতায় ধীরে ধীরে সাজিয়ে তোলেন চাষিদের বিঘার পর বিঘা জমি। সেই জমিতে এখন শুধু পলিমালচিং-এর ভেতর দিয়ে উঁকি মারছে সজীব, সতেজ লঙ্কার গাছগুলি।
কৃষি দফতর হাতে কলমে চাষিদের দেখিয়ে দিয়েছে কিভাবে কম পরিমাণ জমিতেও বৈজ্ঞানিকভাবে লঙ্কা চাষ করে দীর্ঘ ৬ থেকে ৮ মাস যেমন টানা ফসল পাওয়া যায় তেমনই এক বিঘা জমিতে সঠিক পরিচর্যা নিয়ে কৃষক এই সবজি চাষ করলে লক্ষাধিক টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারেন। এতদিন তাঁরা এই সবজির চাষ করতেন কৃষি দফতরের পরামর্শ ছাড়া। কিন্তু কৃষি দফতর জেলার চাষিদের খেতে যে মিরাকল ঘটাবে তা তাঁরা স্বপ্নেও ভাবেননি। তাইতো ব্লকের সান্তালডি মৌজার কররিয়া গ্রামের কৃষকদের ক্ষেতগুলি আজ প্রদর্শনীক্ষেত্র। গোটা জেলার মধ্যে লঙ্কা চাষে মডেল হতে চলেছে এই ব্লক।
লাভের অঙ্কটা কেমন থাকে এই চাষে? জানা গেল এই গ্রামেরই লঙ্কা চাষি বুদ্ধেশ্বর মাহাতোর কাছ থেকে। বুদ্ধেশ্বর তাঁর আধবিঘা জমিতে লঙ্কা চাষ করেছেন। কৃষি দফতরের হিসেব অনুযায়ী এই আধ বিঘা জমিতে বারোশো লঙ্কা গাছ হয়েছে। যা থেকে আগামী ছ’মাসে একেকটি গাছ থেকে কম করে হলেও এক কেজি করে লঙ্কা পাবেন চাষি। সেই হিসাবে ১২ কুইন্টাল লঙ্কা পাবেন চাষি। ন্যুনতম ৪ হাজার টাকা প্রতি কুইন্টাল হিসাবে চাষি ৬ মাসে আয় করবেন ৪৮ হাজার টাকা। এই পরিমাণ টাকা অন্য কোন চাষে এত কম সময়ে পাওয়া যায়না।
তবে এই চাষে ঝুঁকি হচ্ছে ভাইরাসের আক্রমণ। মূলত চাষিরা পাতা কুঁকড়ে যাওয়া বা লিফ কার্লের সমস্যায় ভোগেন। ব্লকের অন্যতম অ্যাসিস্ট্যান্ট টেকনোলজি ম্যানেজার বিশ্বজিৎ ব্যানারজি কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে আজ চাষিদেরকে আশ্বস্ত করেছেন।
তাই বলাই যেতে পারে লঙ্কা চাষেও চাষি লাখপতি হতেই পারেন।
সন্দীপ সরকার, পুরুলিয়া