Story

কেমন আছেন বন্ধুরা? বলছিলাম, বেঁচে থাকার জন্য আপনার এই ডেলি লাইফে যা যা প্রয়োজন তার যে-কোন একটা উইঙ্গসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকতে দেখবেন টাটাকে। গাড়ি হলে টাটা মোটরস সঙ্গে ল্যান্ড রোভার-জাগুয়ার, ফ্লাইট হলে ভিস্তারা-এয়ার ইন্ডিয়া, হোটেল ব্যবসা হলে তাজ হোটেল, ঘড়ি হলে টাইটান, জামা-কাপড় হলে ওয়েস্ট সাইড, জুয়েলারি হলে তানিস্ক, চা হলে টাটা টি এমনকি নুন হলে টাটা সল্ট। এছাড়া টিসিএস, টাটা পাওয়ার, টাটা স্টিলের মতন ১০০ কোম্পানি রয়েছে টাটা গ্রুপের আন্ডারে। সুতরাং, এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে আজকের দিনে দাঁড়িয়ে টাটা গ্রুপ দেশের সর্বকালীন সফলতম সংস্থাগুলোর মধ্যে একটা। কিন্তু ভাবতে পারবেন না, এই টাটা গ্রুপ হঠাৎ করে আলাদীনের আশ্চর্য প্রদীপ হাতে পায়নি। টাটা গ্রুপের এই সুবিশাল সাম্রাজ্য তিল তিল করে গড়ে তুলতে সময় লেগেছে ২০০ বছর। হ্যাঁ, ঠিকই। আসুন, আজ বলব সেই গল্পটা। জেনে নেব টাটার ইতিহাস।
গল্পটা শুরু করা যাক ১৮২২ সাল থেকে। মানে, ঠিক ২০০ বছর আগে থেকে। গুজরাতের একটি গ্রামের এক পার্সি পরিবারে জন্ম হল এক পুত্র সন্তানের। নাম নাসারওয়াঞ্জি টাটা। শৈশব থেকেই তাঁর মধ্যে অদ্ভুত একটা জেদ ছিল। এবং তিনি সবসময়ই বিশ্বাস করতেন তাঁর নিশ্চয়ই আলাদা কিছু করার ক্ষমতা আছে। বলা হয়, সেই সময় ঐ গ্রামে তিনিই একজন ছিলেন, যিনি মাত্র ২০ বছর বয়সে স্ত্রী এবং সন্তান নিয়ে চলে আসেন মুম্বই। নতুন ব্যবসা শুরুর জন্য। মুম্বই এসে কটন ট্রেডের ব্যবসা করবেন বলে ঠিক করেন। সঙ্গে সঙ্গে শুরু করে দিলেন কটন এক্সপোর্ট করা। তিনি যা আয় করতেন, সেখান থেকে অনেকটাই খরচ করতেন তাঁর ছেলে জামশেদজি টাটার পড়াশুনোয়। সেই সময় তাঁকে দেশের বেস্ট এডুকেশন দিয়েছিলেন। তার মানে ইংলিশ এডুকেশন। পড়াশুনো শেষ হলে ছেলেকে হংকং পাঠানোর কথা ভাবেন নাসারওয়াঞ্জি টাটা, ব্যবসার প্রসারের জন্য। সাল ১৮৫৯। জাহাজে করে ২০ বছরের জামশেদজি টাটা বাবার মতনই স্ত্রী, পুত্রকে নিয়ে রওনা দিলেন হংকংয়ের উদ্দ্যেশ্যে। জামসেদজি নিজেও একজন সফল বিজনেসম্যান হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করলেন। ৬৫ বছরের জীবনে জামসেদজি তিনটি আলাদা কন্টিনেন্টে ব্যবসা করেছেন। ভারতে প্রচুর কটন মিল খুলে ফেলেন তিনি। একইসঙ্গে দেশের সর্বপ্রথম স্টিল ফ্যাক্টরির কনস্ট্রাকশন শুরু করেন। একইসঙ্গে দেশের প্রথম ফাইভ স্টার হোটেলও তিনি খুলে ফেলেন। সেইসময় দাঁড়িয়ে একমাত্র এই হোটেলেই ইলেক্ট্রিসিটি ছিল বলে জানা যায়। যা তাজ হোটেল বলে পরিচিত। ১৯০৪ সালে প্রয়াত হলেন জামসেদজি টাটা। এখানেই একটা বিষয়। ১৮৭৪ সালে জামসেদজি টাটা যখন প্রথম নাগপুরে কটন মিল খুললেন, দেখতে পেলেন ওখানকার শ্রমিকরা আলস্যে দিন কাটাচ্ছে। এমনকি একটা দিনও যায়নি, তিনি কর্মীদের ১০০% উপস্থিতি দেখেছিলেন। তিনি বুঝতে পারেন, এদের কাজের প্রতি উৎসাহ বাড়াতে হবে। আর যে কারণে তিনি জেনারেল প্রভিডেন্ট ফান্ড তৈরি করলেন। বললেন, রিটায়ারমেন্টের পরেও কর্মীরা পেনশন পাবেন। এছাড়াও চালু করেন ইনশিওরেন্স স্কিম।
১৮৬১ সালে শুরু হল সিভিল ওয়ার। কিন্তু এই যুদ্ধ জামশেদজির জন্য সুসময় বয়ে নিয়ে এলো। ইংল্যান্ড সেই সময় কটন র মেটিরিয়াল আমেরিকা থেকে আমদানি করত। জামশেদজি বেশি দামে সেই মেটেরিয়াল ইংল্যান্ডকে দেওয়া শুরু করে দিলেন। লন্ডনে নিজের অফিসও করেন। কিন্তু চার বছর পর যখন যুদ্ধ শেষ হল তখন লোকসানের বোঝা ঘাড়ে চাপতে বসল জামশেদজির। ইনভেস্টররা জামশেদজির কাছ থেকে রিটার্ন চাইতে শুরু করলেন। কিন্তু জামশেদজি সময় চেয়ে নিলেন। তখন ইনভেস্টররা তাঁকে মাসিক ২০ পাউন্ডের বিনিময়ে কাজ করতে বললেন। এরপর জামশেদজির পুত্র দোরাবজি টাটা তাঁর বাবার স্বপ্নপূরণে ময়দানে নামলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় টাটা দেশের সবচেয়ে বড় স্টিল সাপ্লায়ার হিসেবে উঠে আসে। ব্রিটিশদের মধ্যে টাটা স্টিল অত্যন্ত জনপ্রিয়তা পেল। ১৯১৪ সালে টাটা এত বড় সংস্থা হয়ে উঠল যে টাটা গ্রুপের মধ্যেই ১৪টি আলাদা বড় বড় কোম্পানি থেকে যায়। এরপর দোরাবজি টাটার এক দূরের কাসিন জে আর ডি টাটা এই সাম্রাজ্য এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য হাত ধরেন। জেআরডি টাটার বড় হওয়া ফ্রান্সে। তিনি নিজেও একজন দক্ষ পাইলট ছিলেন। আর যে কারণে দেশের সর্ববৃহৎ এয়ারলাইন্স ভারতে নিয়ে এলেন তিনিই। যার নাম টাটা এয়ার লাইন্স, ভবিষ্যতে যার নাম হল এয়ার ইন্ডিয়া। এরপর নেহেরু যখন ন্যাশনালাইজ করতে শুরু করলেন, তখন জেআরডি টাটার মন ভেঙ্গে গেল। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন, ব্যবসা শুধু লাভের জন্য নয়। একটা নেশন তৈরির জন্যও বটে। ১৯৭০-৮০ সালে এয়ার ইন্ডিয়া বিশ্বের অন্যতম প্রেস্টিজিয়াস এয়ারলাইন হিসেবে পরিচিতি পায়। ১৯৪৫ সালে টাটা মোটরস গাড়ি তৈরি শুরু করে। একইসঙ্গে শুরু হয় লোকোমোটিভ ইঞ্জিন তৈরির কাজ। ১৯৬৮ সালে চালু হয় টাটা কনসালটেন্সি সার্ভিস। আজকের দিনে টিসিএস দেশে সবথেকে বেশি কর্মসংস্থানের পথ দেখিয়েছে ইন্ডিয়ান রেলওয়েজের পর। এছাড়া ক্যান্সার রিসার্চ সেন্টার, নুনের ব্যবসা থেকে শুরু করে ইলেকট্রনিক ম্যানুফ্যাকচারিং- জেআরডি টাটা ৫২ বছর ধরে ব্যবসার বিস্তৃতি ঘটালেন। এই সময় টাটার আন্ডারে ৯৫টি কোম্পানি চলে আসে। এরইমধ্যে ১৯৭১ সালে নেলকো- যে রেডিও ম্যানুফ্যাকচার করা হত, তার মার্কেট শেয়ার কমে ২ শতাংশে এসে দাঁড়ায়। কিন্তু ততদিনে ৯ বছর হয়ে গেল টাটা গ্রুপ সামলানোর জন্য মাথা খাটানো শুরু করে দিয়েছেন রতন টাটা।
১৯৭১ সালে তাঁর ওপর নেলকোর দায়িত্ব এসে পড়ে। রতন টাটা রেডিও ম্যানুফ্যাকচারিং বন্ধ করিয়ে স্যাটেলাইট কমিউনিকেশনের উপরে কাজ শুরু করেন। তিন বছরের মধ্যে নেলকোর মার্কেট শেয়ার ২০% এসে পৌঁছয়। এরপর ১৯৯১ সালে শুরু হল অর্থনীতিতে লিবারালিজেশন। রতন টাটা নিজেদের ব্যবসা এতটাই বাড়াতে শুরু করলেন যে অন্য কোন সংস্থার পক্ষে টাটার সাবসিডিয়ারি কোম্পানিগুলো ক্রমশ বাড়তে শুরু করল। উল্টোদিকে টাটা বিদেশী সংস্থা অ্যাকোয়ার করতে শুরু করে দিল। ইংল্যান্ডের টেটলি টি, ইউরোপের স্টিল জায়ান্ট কোরাস, এছাড়া জাগুয়ার, ল্যান্ডরোভার আরও কত কি। দেখতে দেখতে টাটা গ্রুপ পৃথিবীর অন্যতম সফল প্রতিষ্ঠান হিসেবে জায়গা করে নিল পৃথিবীর বুকে। এভাবেই সাফল্যের একেকটা ধাপ পেরিয়ে উঠে আসতে শুরু করল টাটা গ্রুপ। প্রতিবেদনটি যদি ভালো লেগে থাকে তবে লাইক, শেয়ার এবং সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের চ্যানেল বিজনেস প্রাইম নিউজ।