Daily
জাপানের আয়তন কত জানেন? ৩ লক্ষ ৭৭ হাজার ৯৭২ বর্গ কিমি। আর রাজস্থানের আয়তন কত জানেন? ৩ লক্ষ ৪২ হাজার ২৩৯ বর্গ কিমি। হিসাবের বিচারে দেখলে জাপান রাজস্থানের থেকে একটু বড় একটা দেশ। তবু অবাক হতে হয় জাপানের সার্বিক উন্নতির দিকে যদি চোখ রাখা যায়। ধর্ম, রাজনীতি, অর্থনীতি- সব কিছু যেন জাপানের মাটির সঙ্গে এতটাই ভালোভাবে মিশে গেছে যে দেশটা আজ সবদিক থেকেই টেক্কা দিয়েছে বড় বড় প্রথম সারির দেশগুলোকে। ভারতকে তো বটেই। হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্সের নিরিখে জাপান আজ আমেরিকা, সাউথ কোরিয়ার মতন দেশকেও টেক্কা দিয়েছে। এখানকার মানুষদের জীবনযাত্রা নাটকীয় যতটা, ঠিক ততটাই চমকপ্রদ। ভূমিকম্প, সুনামির মত প্রকৃতির একের পর এক অত্যাচার সহ্য করেও যেভাবে জাপানের মানুষগুলো নিজের দেশকে উন্নতির পথে হাঁটিয়ে নিয়ে চলেছে, সেই দেশের অর্থনীতির ভিত যে মজবুত হবে সেটা কি আর আলাদা করে বলে দিতে হয়? আসুন, আজ বরং ভারত ছেড়ে চলে যাওয়া যাক প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে অবস্থিত ছোট্ট দ্বীপ জাপানে। আলোচনা করা যাক কিভাবে তাদের অর্থনীতি এতটা মজবুত হল, সেই নিয়ে।
জাপানের পোশাকি নাম নিপ্পন-কোকু বা নিহন-কোকু। যার অর্থ সূর্যোদয়ের দেশ। জাপানের মুদ্রার নাম হচ্ছে ইয়েন। ৪.৯ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে সমৃদ্ধ জাপান তালিকায় রয়েছে তিন নম্বরে। জাপান সবদিক থেকেই উন্নত একটা দেশ। এই দেশে জীবনযাত্রার মান উন্নত। একইভাবে মানব উন্নয়ন সূচকেও জাপান রয়েছে উন্নতির শিখরে। বিশ্বশান্তি সূচকেও জাপান এগিয়ে রয়েছে একেবারে শুরুতেই। জাপান ভূখণ্ডের ৭৩% এলাকা হচ্ছে বনভূমি এবং পাহাড় পর্বতে ঘেরা। ফলে জাপানের ভূখণ্ড কৃষিকাজের জন্য তেমন একটা উপযোগী নয়। তাই জাপানের জনবসতি অঞ্চলগুলি হয়ে উঠেছে খুবই ঘন বসতিপূর্ণ। আমরা অনেকেই মনে করি, জাপান আসলে অত্যন্ত দূরদর্শী একটি দেশ। তার প্রমাণ পাওয়া যায় বহুযুগ আগে থেকেই। একটা সময় জাপানে ছিল সামুরাই যুগ। সেই সময় জাপান ব্যবসা-বাণিজ্য, ধর্ম, সংস্কৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ ছাপ রাখছিল। কিন্তু সেই সময় জাপানে কোন কেন্দ্রীয় শাসন ছিল না। আধুনিক জাপানের ইতিহাস রচনা করেন সম্রাট মেইজি। যিনি ১৮৬৮ থেকে ১৯১২ সাল পর্যন্ত জাপান শাসন করেছেন। তাঁর আমলেই আধুনিক জাপানের রূপরেখা তৈরি হয়। তিনি সর্বপ্রথম একটি পার্লামেন্ট প্রস্তুত করেন। চালু করেন ট্যাক্স সিস্টেম। জাপান সরকারের আয় এভাবেই ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করল। মেইজি প্রথমেই ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্টের দিকে নজর দেন। একইসঙ্গে শিক্ষার মানের দিকে নজর ছিল মেইজির। মেইজির লক্ষ্য ছিল কিভাবে জাপানকে সবদিক থেকে এগিয়ে রাখা যায়। তার জন্য তিনি নজর দেন সামরিক শক্তির দিকে। একইসঙ্গে নজর দেন ম্যানুফ্যাকচারিং-এর দিকে। জাপানে একইসঙ্গে চালু হয় ফরেন ট্রেড পলিসি। এর ফলে বিভিন্ন দেশের ব্যবসায়ীরা জাপানের সঙ্গে নিজেদের ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিধি ক্রমেই বাড়াতে শুরু করে। খেয়াল করলে দেখা যাবে, উনিশ শতকের গোরার দিকে যেখানে রাশিয়া ছিল বিশ্বের সবথেকে উন্নত দেশ, কারণ সেই দেশে সবচেয়ে বেশি ব্যবসা বাণিজ্য হত, দেখা গেল, ১৯০৬ সালে সেই রাশিয়াকে টপকে জাপান এগিয়ে গেল ব্যবসা-বাণিজ্য করার জন্য।
অনেকেই বলে থাকেন যে জাপান এই সার্বিক উন্নতির পথে এগোতে পেরেছে একমাত্র শিক্ষার জন্য। জাপানে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের স্কুল থেকেই শিক্ষার পাঠ দেওয়া হয়, কিভাবে তারা সমাজের উন্নতির স্বার্থে নিজেদের নিয়োগ করতে পারে। জাপানে কোন কাজই ছোট নয়। প্রতিটা কাজকে সম্মান দেওয়ার মত শিক্ষা ছেলেমেয়েদের দেওয়া হয় ছোট থেকেই। তবে জাপানে শিল্পের চাকা সবচেয়ে বেশি দ্রুত ঘুরতে শুরু করে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর। সেই সময় জাপানে টয়োটা, হন্ডা, সুজুকি, নিশান, মিতসুবিসির মত একের পর এক গাড়ি কোম্পানির পত্তন ঘটে। এখানেই বলি, দু’দুটো বিশ্বযুদ্ধে জাপান ফ্রন্টফুটে থেকে অংশ নিয়েছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানের তেমন একটা ক্ষতি না-হলেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপান একেবারে ধ্বংসের কিনারে এসে দাঁড়ায়। পার্ল হারবার অ্যাটাক করার পর জাপানে আছড়ে পড়ে দুটো পারমানবিক বোমা। সেই বোমার আঘাতেই ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় জাপানের যাবতীয় উন্নয়নের স্বপ্ন। তারপর জাপান ঠিক করে আর সামরিক শক্তিকে সেভাবে বাড়াবে না দেশটা। মার্কিন মুলুকের সঙ্গে চুক্তি হয়। সামরিক বাহিনীর অফিসাররা জাপানের শিল্পকর্মে নিজেদের নিয়োজিত করেন। জাপানের প্রতিটা মানুষ যেহেতু শিক্ষা, ম্যানুফ্যাকচারিং-এর মত বিষয়ে হাত পাকিয়ে নিতে পেরেছিল, তাই জাপান সরকারের সহযোগিতায় জাপানের অর্থনীতি ফের ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে দেয়। এমনকি জাপানের সংস্থাগুলো আমেরিকায় নিজেদের ব্যবসা ছড়ানোর দিকে মনোযোগী হয়।
অনেক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে জাপানে শিল্পের বিকাশ এতো ভালোভাবে হওয়ার একটা কারণ হল, প্রকৃতি। মানে জাপানে যে পরিমাণ ভূমিকম্প হয় তেমন আর অন্য দেশে খুব একটা হয় না। ফলে জাপানের কর্মীশ্রেণীরা সবসময় খেয়াল রাখে কিভাবে তারা তাদের প্রোডাক্ট-এর লঞ্জিভিটি বাড়াতে পারে। বছর বছর ধরে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে অবশেষে জাপান নিজেদের স্থাপত্য বা ইঞ্জিনিয়ারিং বা যে কোন ধরণের কর্মকাণ্ডে নিজেদের দক্ষতার ছাপ রাখতে শুরু করে দেয়। জাপান নিজের টেকনোলজিকে কতটা এগিয়ে নিয়ে যায়, তার একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। ১৯৬৪ সালে জাপান প্রথম নিয়ে আসে বুলেট ট্রেন। ঘণ্টায় ২০০ কিমি-এর বেশি বেগে ছুটতে পারা এই ট্রেন গোটা বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিতে পেরেছিল। বর্তমানে বুলেট ট্রেন আরও বেশি উন্নত হয়েছে। পৃথিবীর একটি মাত্র দেশ জাপান, যে এখনো অন্যান্য দেশে বুলেট ট্রেন তৈরিতে নিজেদের অভিজ্ঞতাকে সবচেয়ে বেশি কাজে লাগায়। এছাড়াও হচ্ছে পাংচুয়ালিটি। আমরা সকলেই জানি, জাপানে কোন ট্রেন এক মিনিট দেরি করে না। আর শুধু ট্রেন বলে নয়। এই দেশের প্রত্যেকটা মানুষ সময়ের ধরাবাঁধা বিষয়টাকে খুব ভালো চোখে দেখে। নির্দিষ্ট সময়ে নিজের কাজ সম্পন্ন করার মত শিক্ষা জাপান পেয়ে থাকে বহুদিন ধরে। একইসঙ্গে জাপানের সাধারণ মানুষ সরকার প্রদত্ত নিয়মগুলি খুব ভালোভাবে মেনে চলেন। একইসঙ্গে বজায় রাখেন কমিটমেন্ট। অর্থাৎ, জাপানের সাধারণ মানুষ কমিটমেন্টের বদল করেন না।
এছাড়াও জানা যায়, জাপান সরকার মোটা অঙ্কের টাকা খরচ করে আরএনডি খাতে। একইসঙ্গে জাপান নিজের ক্রেডিট এক্সপ্যানশন পলিসি গ্রহণ করে দেশবাসীর মান অনেকটা হল ভালোভাবে ধরে রাখতে পেরেছে। এছাড়াও এই দেশে ব্যাঙ্কের লোন নিলে তার ইন্টারেস্ট রেট অনেকটাই কম থাকে। মাত্র ১% মতন। ফলে জাপানবাসী ভালোরকম একটা আর্থিক স্বাধীনতা পায়। এগুলো বাদ দিলেও আরও একটা বিষয় জাপানের অর্থনীতি এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য দারুণ কাজ করেছে। আর সেটা হল করাপশন ফ্রি। জাপানে করাপশন প্রায় নেই বললেই চলে। সেখানকার প্রত্যেকটি মানুষ সুন্দর এবং স্বচ্ছভাবে নিজের লাইফস্টাইল লিড করতে ভালোবাসে। সবমিলিয়ে জাপান আজ নিজের দেশকে এগিয়ে নিয়ে গেছে অনেকটা দূর। মজবুত করেছে নিজেদের অর্থনীতি। আর সত্যি বলতে কি, জাপান যেভাবে একেকটি মানুষকে অত্যন্ত ছোট থেকে বড় করার মত শিক্ষা দেয় সেটাই হয়ত গোটা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করে ভালোরকম।
বিজনেস প্রাইম নিউজ।
জীবন হোক অর্থবহ