Story
সাল ১৬০৮। ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় ভারতের বুকে পা রাখে ব্রিটিশরা। ১৯৪৭, ভারত থেকে চিরতরে বিদায় নেয় ব্রিটিশরা। সময়ের ব্যবধান ৩০০ বছর। ব্রিটিশদের রাজত্ব চলে ২০০ বছর ধরে। আর এই সময়ের মধ্যেই ভারতের কাছ থেকে তিলে তিলে ৪৫ ট্রিলিয়ন ডলার চুরি করে নিয়েছে গ্রেট ব্রিটেন। ভারতের প্রোগ্রেস কতটা হয়েছে সে-সম্পর্কে পাশ্চাত্যের দেশগুলো তেমন একটা ওয়াকিবহাল না হলেও, আমরাই বা কতটুকু জানি? রেল পথ, ডাক ব্যবস্থার মত একের পর পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে ভারতের সার্বিক বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য ছাপ রেখেছে। কিন্তু ভারতের মুখ চেয়েই কি ব্রিটিশরা এই ডেভেলপমেন্টের জন্য ঝাঁপায়? নাকি সেখানে লুকিয়ে ছিল স্বার্থসিদ্ধির এক নিষ্ঠুর পরিহাস? কিভাবে?
ইতিহাসের পাতা ওলটালে দেখা যায়, চারশো থেকে পাঁচশো বছর আগে অবিভক্ত ভারতের মত সমৃদ্ধশালী দেশ বিশ্ব মানচিত্রে খুবই কম ছিল। সেই সময় ওয়ার্ল্ড ইকোনমির ২৩% জিডিপি একা ভারত শেয়ার করত। আর যে কারণে ভাগ্য ফেরানোর জন্য ভারতে পা পড়ে তুর্কি, পর্তুগীজ বা ব্রিটিশদের। ব্যবসায় নিজেদের শ্রীবৃদ্ধি করার জন্য প্রত্যেকেই বিভিন্ন সময়ে হাজির হয় এখানে। ১৬০৮ সালে গুজরাতের সুরাটে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রথম নিজেদের পা ফেলে। এখান থেকেই ব্যবসা বিস্তৃতির জন্য কোস্টাল লাইন ধরে এগোতে এগোতে শুরু করে ব্রিটিশরা। বোম্বে, মাদ্রাজ থেকে শেষে বাংলা। সেই সময় ব্রিটিশদের চাল বা টেকসটাইল জাতীয় পণ্য কিনে ইউরোপের বাজারে বিক্রি করত। বিনিময় মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করত সোনা বা রুপো। এই সময় ভারত এবং ব্রিটিশ দু’পক্ষই বেশ লাভবান হচ্ছিল। কিন্তু পট পরিবর্তন হয় ১৭৬৪ সালে। বাংলায় মীর কাশিম থেকে দিল্লির মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলম পরাজিত হন ব্রিটিশ শক্তির কাছে। যা বক্সার যুদ্ধ নামে বিখ্যাত। বাংলার কর ব্যবস্থার দায়িত্ব পুরোপুরি নিজেদের হাতে নিয়ে নেয় ব্রিটিশরা। এবং ধীরে ধীরে তারা এই নিয়ম চালু করে দেয় গোটা ভারতে। বাড়তে থাকে লোভ, বাড়তে থাকে লাভ। এই সময় ব্রিটিশরা যে সকল পণ্য বাইরে বিক্রি করত তা পুরোটাই হত এই করের টাকায়। মানে, ভারতের কোষাগার ক্রমেই ফাঁকা হতে শুরু করে বিদেশী মুদ্রা কার্যত বন্ধ হতে শুরু করায়। তার মানে ক্ষতির বোঝা তখন থেকেই বইতে শুরু করে দেয় দেশের মানুষগুলো। এরপর ১৮৫৮। প্রতিষ্ঠা পেল ঔপনিবেশিক শাসন। মুছে গেল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। গোটা ভারতের নিয়ন্ত্রণ এখন ব্রিটিশ শাসকের হাতে। স্বাভাবিকভাবেই, এই বিরাট দেশ থেকে ট্যাক্স আদায়ের যাবতীয় কর্মকাণ্ড নিজেদের হাতে নিয়ে নেয় ব্রিটিশ সরকার। দেশের বাইরে ব্যবসা করতে গেলে বিনিময় মাধ্যম হিসেবে কমে যায় সোনা বা রুপোর ব্যবহার। বরং ব্রিটিশরা একটা বিল নিয়ে আসে। যে বিল ভাঙানো যেত একমাত্র ব্রিটিশ অফিসেই। কিন্তু হাস্যকর বিষয় হচ্ছে, যে টাকা সেই সময় এই বিল ভাঙিয়ে দেওয়া হত সেটাও ঐ করের টাকাই। ব্রিটেন থেকে সেইসময় পাউন্ডের মতন অর্থ পুরোপুরি ভাবে ভারতে আসা বন্ধ হয়ে যায়।
এরপর ইউরোপে শুরু হয় শিল্প বিপ্লব। ইংল্যান্ডে সেই বিপ্লবের ঝড় ওঠে। প্রয়োজন পড়ে প্রচুর পরিমাণ লোহা, ইস্পাতের মতন কাঁচামালের। যার জোগান একমাত্র দিতে পারত আমাদের ভারত। যা প্রায় বিনা পয়সায় ভারত থেকে লুটে নিয়েছিল তারা। ব্রিটেনে শিল্প বিপ্লব হলেও ভারতে একের পর এক শিল্পের ভবিষ্যৎ তখন দাঁড়িয়ে যায় প্রশ্নের মুখে। টেক্সটাইল, শিপ বিল্ডিং, আয়রন, মাইনিং ইন্ডাস্ট্রিগুলো কার্যত ধ্বংস হতে শুরু করে। বেকারত্ব, দারিদ্র্য তখন ভারতে নিত্যদিন বাড়তে শুরু করে। একটা সময় ভারতের অর্থনীতি ২৩% থেকে নেমে গিয়ে দাঁড়ায় মাত্র ৪ শতাংশে। এছাড়া কোহিনুর থেকে মসলিনের মত চুরি তো রয়েছেই। যার অনেকটাই আজ ঠাঁই পেয়েছে ব্রিটিশ মিউজিয়মে। এমনকি বিশ্বযুদ্ধের সময় ভারত ৭০ মিলিয়নের মত পণ্য সাপ্লাই করেছে ব্রিটেনকে। কিন্তু সেই ইতিহাসই বা আজ কোথায়? মনে করা হয় সেই সময় ভারতের ক্ষতির অঙ্কটা দাঁড়িয়েছিল ৮ বিলিয়ন পাউন্ডের মতন। আর এই পুরোটাই খরচ হয়েছে ভারতের করের টাকায়। এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আলাদা খরচ হয়েছিল প্রায় ১.৫ বিলিয়ন পাউন্ড মতন। এখানেই আরেকটা কথা বলি। গোটা ভারত জুড়ে যে রেল ব্যবস্থা বা ডাক বিভাগের প্রচলন তারা করেছিল সেই পুরো ইনফ্রাস্ট্রাকচার তৈরি হয়েছিল ভারতের করের টাকায়। আর ২০০ বছরে এই টাকার অঙ্কটাই জমতে জমতে পৌঁছে যায় ৪৫ ট্রিলিয়ন ডলারে। এমনকি ব্রিটেনের অসহযোগিতার ছবিটা স্পষ্ট হয় ১৯৪৩ সালে বাংলার দুর্ভিক্ষের সময়। কিন্তু ব্রিটেনের থেকে না পাওয়া গিয়েছে খাদ্য, না-পাওয়া গিয়েছে কোনরকম অর্থসাহায্য। মারা গিয়েছিল ২ লক্ষের কাছাকাছি মানুষ। তাহলে বুঝতে পারলেন তো যে ২০০ বছরের রাজকীয় ঐতিহ্য বলে চালানো ব্রিটিশরা কিভাবে ভারতের গোটা অর্থনীতিকে একেবারে নষ্ট করে দিয়েছে? রাজা থেকে কার্যত ফকির বানিয়ে দেওয়া ব্রিটিশদের এই ইতিহাস কি আদৌ পাশ্চাত্যের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব? তারা কি ব্রিটেনের এই গোটা ইতিহাসকে মেনে নিতে পারবে? তার উত্তর দেবে সময়।