Market

ডলারের নিরিখে টাকার দামে পতন অব্যাহত। এখন ১ ডলারের মূল্য ভারতীয় মুদ্রায় ৮২ টাকা হওয়ার অপেক্ষা। আর এতেই কার্যত চিন্তার ভাঁজ পড়েছে আর্থিক বিশেষজ্ঞদের মধ্যে। মার্কিন মুলুকে ৭৫ বেসিস পয়েন্ট সুদ বাড়ানোর পরেই টাকার দাম ৮০, তারপর ৮১-ও ছাড়িয়ে যায়। স্বাভাবিকভাবেই, বিরোধী নেতারা কার্যত রে রে করে ওঠেন। তুলে ধরতে শুরু করেছেন মোদী সরকারের ব্যর্থতাকে। কিন্তু ডলারের নিরিখে টাকার ভ্যালু কমে যাওয়ার ট্র্যাডিশন আজ শুরু হয়নি। শুরু হয়েছিল স্বাধীনতার একটু পর থেকেই।
১৯৪৭ সালে যখন দেশ স্বাধীন হয়েছিল, তখন ১ টাকার ভ্যালু ছিল ১ ডলারের সমান। কথাটা শুনতে একটু অবিশ্বাস্য ঠেকলেও এটাই সত্যি। তখন ডলার এবং রুপির ভ্যালু সমান-সমান ছিল। কিন্তু তারপরেই টাকার ভ্যালু পড়তে শুরু করে। ১৯৫০ সাল নাগাদ সরকার ঠিক করে এবার দেশের একটি সার্বিক উন্নয়নের প্রয়োজন রয়েছে। তার জন্য অনেক টাকা খরচও করে সরকার। কিন্তু সেই পরিমাণ টাকা রোজগার করতে ব্যর্থ হয় কেন্দ্রীয় সরকার। সামাল দিতে সরকার বহু জায়গা থেকে লোন নেওয়া শুরু করে। কিন্তু কোষাগারে হাঁড়ির হাল। এখন সরকারের কাছে প্রশ্ন তৈরি হয়, টাকা শোধ হবে কি করে? অগত্যা সরকার ঠিক করল, বেশি পরিমাণে নোট ছাপানো শুরু করা ছাড়া আরও কোন অপশন নেই। সরকার যত বেশি নোট বাজারে ছাড়বে, ততই কিন্তু টাকার ভ্যালু পড়তে শুরু করবে। এরপর ১৯৬০ থেকে ১৯৭০। এর মধ্যেই ভারতকে বেশ কিছু যুদ্ধ পরিস্থিতির মুখোমুখি পড়তে হয়। তার মধ্যে যেমন রয়েছে ইন্দো-চায়না ওয়ার, তেমনি রয়েছে ইন্দো-পাকিস্তান ওয়ার। ভারতকে আর্থিক দিক থেকে বেশ ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। আবারও বিভিন্ন দেশ থেকে লোন নিতে বাধ্য হয় সরকার। সেই সময় ফরেন ইনভেস্টমেন্টের প্রয়োজন ছিল। আর ফরেন ইনভেস্টমেন্ট তখনি আসে যখন দেখা যায়, দেশে কোন জিনিস সস্তায় তৈরি হতে পারে। তবেই ইনভেস্ট করার আগ্রহ তৈরি হবে। সরকার যে কারণে এক্সচেঞ্জ রেট ১ ডলারের পরিবর্তে করে দেয় ৭ টাকায়। এরপর ১৯৭৩ সালে যখন বিশ্ব জুড়ে তেলের দাম অনেকটা বেড়ে যায় তখন ইন্ডিয়ান কারেন্সি আরও কিছুটা পড়ে যায়। এরপর ১৯৮৪ সালে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যু। নিমেষের মধ্যে ভারতীয় অর্থনীতির উপরে পড়ে ভালোরকম চাপ। দেখা যায়, ১৯৯০ সালে ১ ডলারের নিরিখে টাকার মূল্য দাঁড়ায় ১৭ টাকা ৫০ পয়সার সমান। এরপর থেকে অর্থনীতিতে উদারীকরণ এলো। কিন্তু টাকার ভ্যালু কমতেই থাকল। অন্যদিকে বাড়তে শুরু করেছিল ডলারের ভ্যালু।
দেখতে দেখতে আজ ডলারের নিরিখে টাকার ভ্যালু ৮২-র দোরগোরায় এসে দাঁড়াচ্ছে। চিন্তার মেঘ ঘনিয়েছে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে। নরেন্দ্র মোদী যখন প্রধানমন্ত্রীর কুর্সিতে বসেছিলেন, সেই সময় টাকার ভ্যালু ডলারের নিরিখে ছিল ৫৮.৬২ পয়সা মতন। আজ সেই ভ্যালু ৮২ ছুঁইছুঁই। মনে করা হচ্ছে, টাকার ভ্যালু যদি আরও নামতে থাকে তাহলে তেল-সহ অন্যান্য যাবতীয় পণ্য আমদানি করতে খরচ অনেকটাই বাড়বে। ফলে মূল্যবৃদ্ধি কার্যত চিন্তায় ফেলতে পারে দেশবাসীকে। আমদানি-রফতানি ঠিকঠাকভাবে না-হলে দেখা দিতে পারে বাণিজ্য ঘাটতি। এদিকে ডলারের সঙ্গে যুদ্ধ করতে গিয়ে দেশে কমছে বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার। দেশের শেয়ার বাজারে লগ্নির আগ্রহ কমবে। সব মিলিয়ে দেশের অর্থনীতিতে ভালোরকম বিরূপ প্রভাব ফেলবে। এখন কিভাবে ডলারের নিরিখে ভারতীয় টাকা ফিরতে পারে স্থিতাবস্থায়? কেন্দ্রীয় সরকার সেক্ষেত্রে কি ভূমিকা থাকতে পারে? আপাতত সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছেন দেশবাসী।
বিজনেস প্রাইম নিউজ
জীবন হোক অর্থবহ