Market
আপনি কি জানেন, বিজয় মালিয়া এখনও একজন বিলিওনিয়র ? আমরা এতদিন এটাই জানতাম যে বিজয় মালিয়া ৯০০০ কোটি টাকার ব্যাঙ্ক লোন পরিশোধ করতে না পেরে দেউলিয়া হয়ে গেছে। কিন্তু আসলে একেবারেই তা নয়, বিজয় মালিয়ার সম্পত্তির পরিমাণ এখনও ১.৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি। কিন্তু কিভাবে ? যে ৯০০০ কোটি টাকা লোন পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়ে ভারত থেকে পালিয়ে বিদেশে চলে গেছে, তার কিভাবে এখনও এত টাকা সম্পপ্তি থাকতে পারে – আসলে এর পেছনে রয়েছে অজানা এক সত্য। আসুন বন্ধুরা আজ আমরা আলোচনা করব দেউলিয়া কিংফিশার কোম্পানির মালিক বিজয় মালিয়া কিভাবে আজও বিলিওনিয়র সেই নিয়ে ?
আজ আমরা এই প্রতিবেদনে আলোচনা করব কে এই বিজয় মালিয়া ?
মাত্র ২ বছরের মধ্যে কেন দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এয়ারলাইন কোম্পানি কিংফিশার ডুবে গেল ?
আর লোন পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়ে কেনই বা বিজয় মালিয়া লন্ডন চেল গেলেন ?
এবং কোম্পানি দেউলিয়া হওয়া সত্ত্বেও কিভাবে আজও বিজয় মালিয়া ১.৫ বিলিয়ন ডলারের মালিক ?
পরাধীন ভারতবর্ষ। ১৯৪৬ সাল। নামের এক ব্যক্তি United Breweries Group-এ কাজ করতে শুরু করেন। এরপর তিনি ইউবি গ্রুপের বিভিন্ন স্টকস অধিগ্রহণ করা শুরু করেন এবং ঠিক ৪ বছর মধ্যে ১৯৫০ সালে ভিত্তাল মালিয়া ইউবি গ্রুপের চেয়ারম্যান পদে নিযুক্ত হন। ক্রমশই কেমিক্যাল, পেপার, ফার্মা ইত্যাদি সেক্টরে কোম্পানি নিজেকে সফলভাবে প্রসারিত করতে শুরু করে। এরপর ১৯৮৩ সালে ইউবি গ্রুপ ৩৫০ কোটি টাকার রেভেনিউ মার্ক স্পর্শ করে। কিন্তু হঠাৎই হার্ট অ্যাটাকে মারা যান ভিত্তাল মালিয়া। আর তারপরেই সমস্ত দায়িত্ব এসে পরে ভিত্তাল মালিয়ার ছেলে বিজয় মালিয়ার উপরে। ব্যবসায় অনাগ্রহী বিজয় ধীরে ধীরে ৩৫০ কোটি টাকার রেভিনিউ মার্ককে ৫০০০ কোটি টাকায় পৌঁছে দেন। ধীরে ধীরে নিজেস্ব এয়ার লাইন্স থেকে আইপিএল টিম সমস্ত জায়গায় নিজের জমি শক্ত করে কিংফিশার।
২০০৫ সালের ৯ই মে বিজয় মালিয়ার ছেলে সিদ্ধার্থ মালিয়ার জন্মদিনের দিন থেকেই কিংফিশার এয়ার লাইনের শুরু হয়। তবে অনেকেই বিজয় মালীয়ার এই এয়ার লাইন খোলার ব্যবসার বিরুদ্ধে ছিলেন। কিন্তু অপ্রতিরোধ্য বিজয় মালিয়া শুরু করলেন কিংফিশার এয়ারলাইন। মাত্র ২ বছরের মধ্যে দৈনিক ১০৪ টি ফ্লাইট নিয়ে আকাশ পাড়ি দিতে থাকে এই এয়ার লাইন। কিংফিশারের এই উত্থানের পেছনে সবথেকে বড় এক্স ফ্যাক্টর ছিল যাত্রী স্বাঞ্ছন্দ। ফাইভ স্টার রেটিং নিয়ে যাত্রীদের প্রথম পছন্দ হয়ে ওঠে কিংফিশার। কিন্তু কি এমন হল যা ডুবিয়ে দিল কিংফিশারকে ? কিংফিশার এয়ার লাইন তাদের ব্যবসার ক্ষেত্রে বেশ কিছু ভুল সিধান্ত নেয়। যার ফলে চমর ক্ষতির সম্মুখীন হয় কিংফিশার।
এই বিষয়ে বিস্তারিত জানার আগে আমাদের মাথায় রাখতে হবে কোন কোন বিষয়ের উপর নির্ভর করে একটি এয়ার লাইন ব্যবসা চলে।
Fuel Cost
হেজিং টেকনিক ব্যবহার করে ফুয়েল কস্ট কিছুটা কমানো সম্ভব।
এয়ারক্র্যাফট Cost
যেসমস্ত এয়ারক্র্যাফট এয়ার লাইন কোম্পানি গুলো ব্যবহার করে, সেগুলো প্রয়োজনে লিজ নেওয়া যায়। এই ভাবে খরচ কমানো সম্ভব।
Staff Cost
সঠিকভাবে পরিকল্পনা করলে স্টাফ কস্টও কিছুটা কমানো সম্ভব। আর এই শেষ দুটি ক্ষেত্রেই বড় ভুল করে বসে কিংফিশার। কিংফিশার তাদের হাইয়াই যাত্রার শুরুতেই যে সমস্ত এয়ারক্র্যাফট ব্যবহার করত, সেগুলো ছিল সবই নতুন। বর্তমানে অন্যতম জনপ্রিয় এয়ার লাইন ইন্ডিগো তাদের বেশিরভাগ এয়ারক্র্যাফট লিজ নিয়ে চালায়। কিন্তু কিংফিশার ব্যবসার শুরুতেই একাহদিক নতুন এয়ারক্র্যাফট কিনে ফেলে। ফলত ব্যবসায় বিনিয়োগের অঙ্কটা অনেকটাই বেড়ে যায়। এছারাও পরিচালনার ক্ষেত্রেও বড় ভুল করে কিংফিশার। সাধারণত এয়ার লাইন কোম্পানি গুলো তাদের কেবিন ক্রু মেম্বারদের ট্র্যাভেল অ্যাকোমোডেশন দিয়ে থাকে। এছাড়াও তাদের ট্রেনিং এর সমস্ত খরচও বহন করতে হয় উক্ত কোম্পানিকে। কিংফিশারে কেবিন ক্রু মেম্বারদের মধ্যে ছেলে – মে উভয়ই ছিল। ফলত তাদের হোটেল রুম দেওয়ার সময় ছেলে ও মে দের আলাদা আলাদা রুম দিতে হত। ফলত হোটেল ভাড়া বৃদ্ধি পায় অনেকটাই। অন্যদিকে বর্তানের ইন্ডিগো এয়ার লাইনে লক্ষ্য করে দেখবেন বেশিরভাগ কেবিন ক্রু মহিলা। ফলত তারা ২-৩ জন মহিলা কেবিন ক্রু কে ট্র্যাভেল অ্যাকোমোডেশন হিসেবে একটি রুমে প্রোভাইড করতে পারে। ফলত হোটেল খরচ কম হয় অনেকটাই। এছাড়াও কিংফিশার কোম্পানির বিভিন্ন আলাদা আলাদা মডেলের এয়ারক্র্যাফট এর ফলে কর্মীদের আলাদা আলাদা ট্রেনিং এর ব্যবস্থা করতে হয়। এর ফলেও খরচ বৃদ্ধি পায় অনেকটাই।
Low Share Price
এরপর কিংফিশার তাদের মার্কেট শেয়ার বাড়ানোর জন্য তাদের শেয়ার পিছু টাকার অঙ্ক কমিয়ে দেয়। যা ছিল কিংফিশার এয়ার লাইনের অন্যতম বড় ভুল পদক্ষেপ। যা কিংফিশারকে কার্যত ডুবিয়ে দেয়।
ইন্টারন্যাশনাল এক্সপ্যানশন
কিংফিশার এয়ার লাইনের সবথেকে বড় ভুল পদক্ষেপ তাদের ইন্টারন্যাশনাল এক্সপ্যানশন এর সিদ্ধান্ত। ২০০৫ সালে শুরু হওয়া কিংফিশার এয়ার লাইন মাত্র ২ বছরের মধ্যেই ইন্টারন্যাশনাল এক্সপ্যানশন এর প্ল্যান করতে শুরু করে। কিন্তু সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কোন এয়ার লাইন নুন্যতম ৫ বছর ডোমেস্টিক পরিষেবা প্রদান করে তবেই আন্তর্জাতিক পরিষেবা চালু করতে পারে। কিন্তু মাত্র ২ বছর হওয়া কিংফিশার যেভাবেই হোক আন্তর্জাতিক পরিষেবা চালু করতে তৎপর হয়ে ওঠে। এমতবস্থায় তাদের কাছে একটাই উপায় ছিল, তা হল অন্য কোন পুরনো এয়ার লাইন কোম্পানি অধিগ্রহণ করা। সেই সময় এয়ার ডেকান নামক একটি এয়ার লাইন ব্যপক লসে চলছিল। ৪ বছর আগে শুরু হওয়া এয়ার ডেকানকে ৫৫০ কোটি টাকায় অধিগ্রহণ করে বিজয় মালিয়া। এরপর শুধু অপেক্ষা ছিল আর মাত্র ১ বছরের। তারপরের দেশ ছাড়িয়ে বিদেশের মাটিতে পাড়ি জমাবার অপেক্ষা। কিন্তু আন্তর্জাতিক পরিষেবা প্রদানের প্রসিডিওর বেশ লম্বা। এছাড়াও তার জন্য দরকার উন্নত মানের কেবিন ক্রু। আন্তর্জাতিক পাইলট। একজন ডোমেস্টিক পাইলটের মাসিক মাইনে যেখানে আনুমানিক ৮-৯ লক্ষ টাকা। সেখানে ইন্টারন্যাশনাল পাইলটের মাসিক মাইনে আনুমানিক ১৪-১৫ লক্ষ্য টাকা। কিংফিশার সমস্ত ইন্টারন্যাশনাল পাইলটদের কে নিযুক্ত করে নেয়। কিন্তু পরিষেবা চালু না হওয়ায় এক কোথায় বসিয়ে বসিয়ে মাইনে দিতে হচ্ছিল তাদের। প্রায় ৯ মাস ধরে এই মাইনে গুনতে হয় কিংফিশারকে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক পরিষেবা দেওয়ার জন্য কিংফসার আরও ৫ টি উন্নত প্রযুক্তির এয়ার বাস কিনে নেয়।
অবশেষে প্রতীক্ষার অবসান। ব্যঙ্গালোর থেকে লন্ডন পর্যন্ত কিংফিশার তাদের প্রথম আন্তর্জাতিক ফ্লাই সম্পন্ন করে। কিন্তু ততদিনে ৪৩০০ কোটি টাকার দেনায় ডুবে গেছে। তবে এখানেই রয়েছে সবথেকে বড় টুইস্ট। বিজয় মালিয়া কিংফিশার এয়ার লাইনে নিজের টাকা বিনিয়োগ করেনি। তিনি ব্যঙ্ক থেকে লোন নিয়েছিলেন। সাধারণত কোন নতুন ব্যবসা শুরু করতে গেলে বেশ কয়েকটি উপায়ে টাকার জোগাড় করা যায়। প্রথমত ব্যঙ্ক থেকে লোন নেওয়া। দ্বিতীয়ত ইকুইটি। নিজেদের শেয়ার বদলে টাকা জোগাড় করা। তৃতীয়ত লাভবান কোন কোম্পানির অর্থ নতুন কোম্পানিতে বিনিয়োগ করা। বিজয় মালিয়া এক্ষেত্রে ব্যঙ্ক থেকে লন নেন। এর কারণ হল ব্যঙ্ক থেকে লোণ নিলে কোম্পানিকে যে অর্থ ইন্টারেস্ট দিতে হয় তার থেকে কময়ানিয়ার ট্যাক্সের অর্থ বাদ যায়। কিন্তু সেটা তখনই সম্বব যখন সেই কোম্পানি মুনাফা অর্জন করবে। এক্ষেত্রে তো গলা পর্যন্ত দেনা দিয়ে লসে ডুবে ছিল কিংফিশার এয়ার লাইন।
এবার আসই আর্থিক তছরূপের কথায়। ব্যঙ্ক থেকে লোন নিতে গেলে তাড় পরিবর্তে ব্যঙ্কে কিছু মর্দগেজ রাখতে হয়। বিজয় মালিয়া অত্যন্ত চালাকির সাথে কোন স্থাবর সপ্ততি ব্যাঙ্কে বন্দক দেন নি। তিনি কিছু কোম্পানির ট্রেডমার্ক বন্দক দেয়। আর এই ট্রেড মার্ক দেখিয়ে তিনি SBI থেকে ৯০০ কোটি টাকার লোন নেন। কিন্তু এরপর অর্থ প্রদানে ব্যর্থ কিংফিশারের রিকভারি করার সময় কেউ ৬ কোটি টাকাও দিতে রাজী ছিল না।
এবার আমরা আলোচনা করব লোন পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়ে কেনই বা বিজয় মালিয়া লন্ডন চেল গেলেন ? আমরা প্রায়ই দেখি আর্থিক তছরুপ করে অনেকেই লন্ডনে গিয়ে আশ্রয় নেন। কিন্তু কেন ? এর কারণ হল ইউরোপিয়ান কনভেনশনস অফ হিউম্যান রাইটস। এর অর্থ হল নিজের স্ব-দেশে যদি কোন ব্যক্তির জীবনের ঝুঁকি থাকে বা অন্যকোন স্পর্শকাতর বিষয়ে সেই ব্যক্তি সেই দেশে থাকতে না চান সেক্ষেত্রে ইউকে সেই ব্যক্তিকে নিজের দেশে আশ্রয় দিতে পিছু পা হবে না। কিন্তু আসল সত্যি হল, যদি আপনি অনেক অর্থ নিয়ে UK পাড়ি দিতে চান, তবে U R ALAWYAS WELCOME. আর এই সুযোগের ফায়দা নিয়ে লন্ডনে পাড়ি দেন বিজয় মালিয়া।
সবশেষে আমরা আলোচনা করব, কোম্পানি দেউলিয়া হওয়া সত্ত্বেও কিভাবে আজও বিজয় মালিয়া ১.৫ বিলিয়ন ডলারের মালিক ?
বিদেশে পাড়ি দেবার আগে বিজয় মালিয়া কোম্পানির শোচনীয় আর্থিক পরিস্থিতি, কর্মীদের বেতন না দিতে পারা ইত্যাদি কারণ দেখিয়ে IDBI ব্যাঙ্ক থেকে ৮৬১ কোটি টাকার লোন নেন। কিন্তু এই টাকা কোনভাবেই কিংফিশারের জন্য ব্যবহার করা হয়নি । এই টাকা তিনি আলাদা ১৩ টি অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করান। বিজয় মালিয়া আজও একজন বিলিয়নিয়র। কারণ তার কাছে UB গ্রুপের আনুমানিক ১৫,০০০ কোটি টাকার স্টকস রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হল ব্যাঙ্ক কেন তার সম্পত্তি নিলাম করে নিজেদের অর্থ উদ্ধার করতে পাড়ছে না। এর পেছনে সবথেক বড় কারণ হল, দ্বি-নাগরিকত্ব। ভারতের পাশাপাশি বিজয় মালীয়া UK এর নাগরিক। নিয়ম অনুযায়ী ভারতীয় ব্যাঙ্ক কোনোভাবেই কোন বিদেশী নাগরিকের সম্পত্তিকে বাজেয়াপ্ত পারে না। ইতিমধ্যেই বিজয় মালীয়ার ভারতীয় স্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেছে। কিন্তু অন্যান্য সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে পারে নি। তাই কোম্পানি দেউলিয়া হওয়া সত্ত্বেও কিভাবে আজও বিলিয়নিয়র বিজয় মালিয়া।
এই প্রতিবেদনে আমরা বিজয় মালিয়ার উত্থান, কিংফিশারের আবির্ভাব ও পতন, লোন পরিশোধ করতে ব্যর্থ বিজয় মালীয়ার লন্ডনে যাওয়ার কারণ এবং এত বড় আর্থিক তছরুপের পর আছো কীভাবে বিলিয়নিয়র বিজয় মালিয়া তা নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা করলাম। প্রতিবেদনটি ভালো লাগলে লাইক করুন, শেয়ার ও সাবস্ক্রাইব করুন। এরকম আরও বিষয় নিয়ে আমরা আপনাদের সামনে আসব। ততক্ষণের জন্য চোখ থাকুক বিজনেস প্রাইন নিউজে। জীবন হোক অর্থবহ।