Story
অতিমারি পরিস্থিতিতে একদিকে শয়ে শয়ে মানুষের হাত থেকে যখন আশা ভরসা সবটুকুই ছিনিয়ে নিয়েছে করোনা ভাইরাস, তখন কৃষিকাজই দেখিয়েছে আয়ের দিশা। তারই একটুকরো ছবি ধরা পড়ল রাজ্যের শুখা জেলা পুরুলিয়ায়। যেখানে সরকারি অনাবাদি জমিকে চাষযোগ্য করা হল। কর্মহীন মানুষ খুঁজে পেলেন আয়ের দিশা।
৪০ জন মহিলা এবং ১০ জন পুরুষ নিয়ে রাজ্য সরকারের সহযোগিতায় শুরু হল মাটি সৃষ্টি প্রকল্পের কাজ। বর্তমানে নিতুরিয়া ব্লকে একসঙ্গে দুটি মাটি সৃষ্টির প্রকল্পের কাজ হচ্ছে। কিন্তু কী এই মাটি সৃষ্টি প্রকল্প?
এখানে যেমন চাষ হয়েছে ভুট্টা, বাদাম, অড়হরের তেমনই একটি বিশাল পুকুর খনন করা হয়েছে। সেই জল একদিকে যেমন কাজে লাগানো হচ্ছে চাষের জন্য তেমনই সেই পুকুরেই আবার মাছ চাষ হচ্ছে। লাগানো হয়েছে প্রায় ৬০০ ফলের গাছ। যার মধ্যে রয়েছে আম, পেয়ারা, সবেদা, কাঁঠাল, নারকেলের গাছ। যে ফলের গাছগুলোকে কলসি সেচের মাধ্যমে গত বছর রোপণ করা হয়। রুক্ষ জমিতে এই পদ্ধতিতে গাছ লাগানোর কারণে একটি গাছও মারা যায়নি। এবার জেনে নেওয়া যাক এই কলসি সেচ আসলে কী?
এটি একটি দেশীয় ড্রিপ পদ্ধতি। চারার গোড়া থেকে এক ফুট দূরে মাটির মধ্যে হাঁড়ি বসিয়ে হাঁড়ির চারপাশে মাটি ও কম্পোস্টের সমান মিশ্রন ছড়িয়ে ঠেসে দিতে হয়। হাঁড়ির মুখ ৩-৪ ইঞ্চি ওপরে রেখে পরিষ্কার জল ভরে দিয়ে মুখ সরা দিয়ে ঢেকে দিতে হয়। তারপর হাঁড়ির গায়ের অতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অসংখ্য ছিদ্র দিয়ে জল চুঁইয়ে বেরিয়ে হাঁড়ির সংলগ্ন মাটিকে ভিজিয়ে দেবে। এইভাবে চোঁয়ানো জলের প্রায় সবটাই গাছ গ্রহণ করে নেয়। জলাকর্ষক ধর্মের জন্য শিকড় হাঁড়ির দিকে বাড়ে এবং হাঁড়িকে ঘিরে শিকড়ের জাল তৈরি করে। এই পদ্ধতিতে ব্যবহৃত জল বাষ্পীভবন বা মাটির গভীরে গিয়ে অপচয় হওয়ার সুযোগ পায়না।
এখানেই শেষ নয়। গরিব মানুষগুলোর পাশে দাঁড়ানোর জন্য মাটি সৃষ্টি প্রকল্পে নেওয়া হয়েছে আরও উদ্যোগ।
একইসঙ্গে স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলাদের হাতে কৃষি দফতরের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন যন্ত্র। যেগুলোর মাধ্যমে তাঁরা বাদাম বা ভুট্টার খোসা ছাড়াতে পারবেন।
আর এই গোটা কর্মকাণ্ডটাই নিজের চোখে দেখলেন জেলাশাসক রাহুল মজুমদার। চারটি মহিলা স্বনির্ভর গোষ্ঠীদের সাথে আলাদা করে আলাপ আলোচনা অভাব অভিযোগের কথা শোনেন। আগামী দিনে এই প্রকল্পের অগ্রগতি আরও কীভাবে করা যায় তার সঠিক পরিকল্পনা ও রূপায়নের ওপর জোর দেন।
কাল যে মানুষগুলোর কাছে উপার্জনের সমস্ত রাস্তা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, ছিল না পেট ভরানোর মত সামর্থ্য আজ মাটি সৃষ্টি প্রকল্পের মাধ্যমে তাঁরাই রোজগার করছেন। চাষ করার জন্য যেমন পেমেন্ট পাচ্ছেন, তেমনই আবার লঙ্কা, কুমড়ো, গাজর ইত্যাদি চাষ করে তাঁরা সেগুলো বিক্রিও করতে পারবেন। দুটো পয়সার মুখ দেখতে পারবেন।
একটা সময় ছিল যখন পুরুলিয়া বলতে শুধু রুক্ষ জমির কথাই মনে আসত। আজ সেখানেও চাষাবাদ হচ্ছে। হাঁস, মুরগি প্রতিপালন করে এখানকার পিছিয়ে পড়া মানুষগুলো জীবনের সঙ্গে লড়াই করছেন। বেঁচে থাকার রসদ খুঁজে পেয়েছেন। কর্মহীন মানুষকে আয়ের দিশা দেখিয়েছে পুরুলিয়া। আর মাটি সৃষ্টি প্রকল্প সেদিক থেকে যে নজির স্থাপন করেছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
সন্দীপ সরকার, পুরুলিয়া