Story
বাপরে! কি ডানপিটে ছেলে! কেউ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে গোটা গ্রাম। কেউ আবার তরতরিয়ে উঠে পড়ছে নারকেল গাছ বা তাল গাছে। চোখের নিমেষে হারিয়ে যাচ্ছে এপাড়া- ওপাড়ার গলিঘুঁজিতে। দুপুর রোদের চোখরাঙানিকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে তারাই আবার বেরিয়ে পরে টো টো করে পাড়া বেড়াতে। পুকুরে সাঁতার কাটা থেকে শুরু করে লাফঝাঁপ কিংবা ভোল্ট দেওয়া যাদের কাছে নস্যি। কিতকিত থেকে লাল লাঠি অথবা ধরুন কাবাডি- খেলাধুলায় শারীরিক কসরতে যারা মাহির। আপনার আমার মুখে যারা তথাকথিত ‘ডানপিটে’, ওস্তাদ অর্চিস্মানের চোখে তারাই শিল্পী। শিল্পীসত্ত্বাকে খুঁজে নিতে শিল্পীর কোনরকম ভুল হয় না। অর্চিস্মানেরও হয়নি। তাইতো এই খুদে ডানপিটেরা, যারা যেকোনোরকম শারীরিক কসরতে শৌর্যশালী, তাদের মধ্যেই খুঁজে পেয়েছেন তাঁর স্বপ্নের ছৌ শিল্পীদের।
দুর্গাপুরের অণ্ডাল থানার উখড়ার বাসিন্দা অর্চিস্মান নিজে ইংলিশ অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের পড়ুয়া। পাশাপাশি একজন পেশাদার বাদ্যশিল্পীও বটে। ছোট থেকেই চামড়ার বাদ্যযন্ত্রের প্রতি একটা বিশেষ দুর্বলতা রয়েছে অর্চিস্মানের। ২০১৭ সালে পরিবারের সাথে পুরুলিয়া ঘুরতে গিয়ে, সেখানকার ঐতিহ্যবাহী ছৌ নৃত্যের প্রতি আকৃষ্ট হন তিনি। পরবর্তীতে সেখানকার মাহির শিল্পীদের সঙ্গে নিজে থেকে যোগাযোগ করেন এবং রীতিমত প্রশিক্ষন নিতে শুরু করেন। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই নিজের ছৌ নৃত্যের দল তৈরির কথা ভাবেন তিনি। যেমন ভাবনা তেমনি কাজ। হ্যাঁ! আপনার আমার কথায় যদিও ব্যাপারটা খানিকটা মাথায় ভূত চাপার মতই। দল গড়তে শুরু হয় গ্রামের ডানপিটেদের খোঁজ। বেশ কয়েকজনের খোঁজ মিলতেই শুরু হয় ট্রেনিং। আর ট্রেনিংয়ে সাফল্য পেতেই শুরু হয় অনুষ্ঠানের রমরমা। একে- দুইয়ে করে আজ অর্চিস্মানের দলে ছৌ শিল্পীর সংখ্যা প্রায় ৫০ –এর কোঠায়।
লোককাহিনী ও পুরাণ কথার গন্ধ মাখানো আদিবাসী ভাষায় সুসমৃদ্ধ পুরুলিয়ার এই বিখ্যাত ছৌ নৃত্য। ছৌ নৃত্যের মধ্যে মহিষাসুরমর্দিনী পালাটি বিশেষ জনপ্রিয়। মানুষের বোঝার সুবিধার্থে আদিবাসী ভাষার সাথে কিছুটা বাংলা যুক্ত করে এই পালাটি মঞ্চস্থ করান ডানপিটেদের ওস্তাদজী। চরিত্রের অনুরূপ মুখোশ পড়ে, গান-বাজনার তালে তালে রীতিমত শারীরিক কসরতের মাধ্যমে এই নৃত্যের প্রদর্শন করেন শিল্পীরা। তাদের দলে যদিও গান বাঁধেন অর্চিস্মান নিজেই। মাটি ও কাগজের মণ্ড দিয়ে নাচের মুখোশও তৈরি করেন তিনি। শুধু কি তাই? ধামসা, মাদল, ঢোল, বাঁশী বাজিয়ে ছৌ নৃত্যকে সমৃদ্ধ করেন তিনি। তাঁর এই মহান কাজের জন্য পদ্মশ্রী পুরস্কারপ্রাপ্ত পুরুলিয়ার বিখ্যাত ছৌ নৃত্যশিল্পী গম্ভির সিং মুড়ার কাছ থেকে ‘ওস্তাদ’ তকমা পেয়েছেন তিনি। বাংলার এই প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী পুরুলিয়ার ছৌ নৃত্যকে বিশ্বের দরবারে ছড়িয়ে দেওয়াই ওস্তাদ অর্চিস্মানের মূল উদ্দেশ্য।
বহু প্রতিকূলতা সত্ত্বেও নিজের স্বপ্ন পুরণ করতে পেরেছেন অর্চিস্মান। তাই তো ওস্তাদের এক ডাকেই ছুটে চলে আসে গ্রামের সব ডানপিটেদের দল। মাত্র পাঁচ বছরে কলকাতা, ঝাড়খণ্ড, বিহার সহ আরও অন্যান্য জায়গা মিলিয়ে প্রায় ৫০ টিরও বেশি অনুষ্ঠান করেছে এই ডানপিটে ছৌ শিল্পীরা। অনুষ্ঠান করতে উঠে যখন সেই মুখোশের ভার বহন করে পারফর্ম করে খুদে শিল্পীরা, তখন মন্ত্রমুগ্ধের মত তাকিয়ে থাকেন আপামর দর্শকমণ্ডলী। অনুষ্ঠানের প্রশংসা পেয়ে বেজায় খুশি এই কচিকাঁচার দল।
মা-বাবা, পরিবার বা প্রতিবেশীই শুধু নয়, এই খুদে ছৌ শিল্পীরা আজ প্রশংসা পাচ্ছে বিশ্বের দরবারেও। এলাকার দুঃস্থ বাচ্চারা, যাদের ভবিষ্যৎ সত্যিই প্রশ্নচিহ্নে দাঁড়িয়ে ছিল, আজ তারাই জীবনের পথে চলার দিশা দেখতে পেয়েছে। আর এই খুদে শিল্পীদের নিয়ে পুরুলিয়ার সুপ্রাচীন সংস্কৃতিকে বিশ্বের দরবারে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য রয়েছে ওস্তাদ অর্চিস্মান পালের এক হার না মানার লড়াই। তাঁর এই অদম্য ইচ্ছেশক্তি সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে।
কাঞ্চন দাস
দুর্গাপুর