Daily
আদানি, আদানি আর আদানি। গৌতম আদানি- দ্য আনস্টপেবল ম্যান অফ ইন্ডিয়া। বিশ্বের তৃতীয় রিচেস্ট পারসন। বিজনেস এক্সপ্যানশনের দিক থেকে আদানি যেভাবে একের পর এক রেস জিতছেন, তাতে কিছুটা হলেও ফিকে হয়েছে অম্বানির গ্লোরি। কেন বললাম বলুন তো? ভেবে দেখুন, ২০১৯ সালে আদানি যেখানে ছোট একটা শহরের মুন্দ্রা এয়ারপোর্ট অপারেট করতেন, সেখানে আজ তিন বছরের মধ্যে ভারতের ছ’ছটি এয়ারপোর্ট আদানির হাতে। আদানি গ্রুপ এখন ভারতের সবচেয়ে বড় এয়ারপোর্ট অপারেটর। সম্প্রতি ভারতের ৬টি এয়ারপোর্টের বিডিং আদানি ক্লিন সুইপ করে নিজেদের হাতে নিয়ে নেয়। সেই ছটি এয়ারপোর্ট কি কি জানেন? মুম্বই, আহমেদাবাদ, জয়পুর, ম্যাঙ্গালোর, গৌহাটি এবং লখনউ। আর শুধু এয়ারপোর্ট নয়। কোল সেক্টরেও আদানি অপ্রতিরোধ্য। কেন্দ্রীয় সরকারের পুরো কোল ইমপোর্ট করার কন্ট্র্যাক্ট নিজেদের হাতে নিয়ে নেয় আদানি গ্রুপ। কিন্তু অনেকেই বলেন, এভাবে একেকটি ব্যবসায় নিজের ম্যাজিকাল এক্সপ্যানশনের পথটা বেশ ফিসি। এমনকি আদানি যেভাবে নিজের হাতে একের পর এক সেক্টরে নিজের ভিত শক্ত করছে সেটাও ইন্ডিয়ান ইকোনমির জন্য বেশ ভয়ের। কিন্তু যে মানুষটার বিজনেস স্ট্র্যাটেজি এতটা স্মুদ, তাঁকে নিয়ে এত ভয় কেন? আসুন, আজকের প্রতিবেদনে তুলে ধরব আদানির অজানা কথা। যেখানে বলব কিভাবে তিনি এই কয়েক বছরের মধ্যেই জিরো থেকে হিরো হয়ে উঠলেন।
২০১০ সাল। কেন্দ্রীয় সরকার ৬ মিলিয়ন টন কয়লা ইমপোর্ট করার জন্য বিডিং করেছিল। যেখানে গ্লোবাল মার্কেটে ছড়ি ঘোরাচ্ছে এমন বেশ কিছু কোম্পানি সেই বিডে অংশ নিতে গেছিল। কিন্তু আদানির কাছে সেই ইনফরমেশন পৌঁছে যায় কয়েকদিন আগেই। বলা হয়, কিছু উচ্চপদস্থ সরকারি আধিকারিকদের মারফৎ এই তথ্য পেয়ে আদানি বড় মার্জিনে জিতে নেন এই কনট্র্যাক্ট। এমনকি এয়ারপোর্ট অপারেটরের জন্য আদানি যেভাবে নিজের বিজনেস স্ট্র্যাটেজি ব্যবহার করেছে, তার বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন কেরালার মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন। তাঁর বক্তব্য ছিল, আদানি গ্রুপ এয়ারপোর্ট অপারেটর সেক্টরে তেমন একটা এক্সপেরিয়েন্সড নয়, বরং মোদীর খুব বিশ্বস্ত এক বন্ধু। কিন্তু গেস হোয়াট…বিজয়নের কথা সেভাবে পাত্তাই পায় নি। যদিও অনেকে বলছেন, এভাবে একের পর এক এয়ারপোর্ট অপারেটর হিসেবে আদানির জিতে যাওয়াটা আসলে খুবই মিস্টিরিয়াস। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এমন মনে হবার কারণ কি? কিরকম বলছি সেটাই। ২০১৯ সালে কেন্দ্রীয় সরকার জয়পুর, লখনউ, গৌহাটি, আহমেদাবাদ, ম্যাঙ্গালুরু এবং থিরুবনন্তপুরমের ছটি এয়ারপোর্ট প্রাইভেটাইজ করার সিদ্ধান্ত নেয়। ডেকে পাঠানো হয় দেশি, বিদেশি বিভিন্ন কোম্পানিকে। কিন্তু দিনের শেষে ৬টি এয়ারপোর্ট অপারেট এবং ডেভেলপ করার দায়িত্ব চলে যায় সটান নান আদার দ্যান মিঃ আদানির হাতে। এখানেও একটা রহস্য। বলা হয়, লখনউ, ম্যাঙ্গালুরু এবং আহমেদাবাদ এয়ারপোর্টের নেট ওয়ার্থ যেখানে ছিল ১৩০০ কোটি টাকা, সেখানে আদানি গ্রুপ এটাকে অ্যাকোয়ার করে নেয় ৫০০ কোটি টাকায়। যদিও মিঃ আদানির প্রধান লক্ষ্য ছিল মুম্বই-এর ছত্রপতি শিবাজি মহারাজ ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট, বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত এয়ারপোর্ট, যেখানে প্রতিদিন ১ হাজার ফ্লাইট ওঠানামা করে। গৌতম আদানি বুঝেছিলেন, এই এয়ারপোর্টকে অ্যাকোয়ার করে নিতে পারলে তিনি হয়ে যাবেন এয়ারপোর্ট সেক্টরে টাইকুন। কিন্তু সেই কনট্র্যাক্ট পাওয়া এত সহজ ছিল না। তার জন্য আদানিকে কাঠখড় পোড়াতে হল জিভিকে গ্রুপের সঙ্গে। যাদের হাতে ছিল মুম্বই এয়ারপোর্টের ৫০% স্টেক। এই জিভিকে গ্রুপ আদানির হাতে মুম্বই এয়ারপোর্টের দায়িত্ব পুরোপুরি ছেড়ে দিতে একেবারেই রাজি ছিল না। তারপরেই এলো একটা মাস্টারস্ট্রোক। ২০২০ সালের জুন মাসে হঠাৎ করেই সিবিআই-এর কাছে একটা চিঠি পৌঁছয়। সেই চিঠি কে পাঠিয়েছে কেউ জানতে পারল না। সেই চিঠির মাধ্যমে জিভিকে গ্রুপের ৭০৫ কোটি টাকার স্ক্যাম একেবারে সবার সামনে নিয়ে এলো। জানা গেল, এয়ারপোর্টের কাজকর্মের জন্য জিভিকে গ্রুপ ৩১০ কোটি টাকা নিয়েছিল। দেখা গেল, পুরোটাই ফেক। আর দ্বিতীয় হল মুম্বই এয়ারপোর্ট রিজার্ভ। প্রায় ৩৯৫ কোটি টাকা জিভিকে গ্রুপ নিজের কাজের জন্য এখান থেকে সরিয়ে নেয়। এসব দেখে সিবিআই হানা দিল জিভিকে গ্রুপের মালিক কৃষ্ণ রেড্ডি এবং সঞ্জয় রেড্ডির অফিসে হানা দেয়। আর এমনই একটা সময়ে আদানি গ্রুপ দিল নিজের মাস্টারস্ট্রোক। প্রথমে মুম্বই এয়ারপোর্টে বিডওয়েস্ট এবং সাউথ আফ্রিকার এয়ারপোর্ট কোম্পানি যাদের হাতে খুব মাইনর স্টেক ছিল, তাদের থেকে ১৫০০ কোটি টাকায় সকল স্টেক কিনে নীল আদানি গ্রুপ। এদিকে জিভিকে গ্রুপ তখন দেনার দায়ে ধুঁকছে। মাথার ওপর ১২ হাজার কোটির দেনা। আদানি বললেন, তুমি আমাকে তোমার সমস্ত স্টেক বিক্রি করে দাও আমি সব দেনা মিটিয়ে দেব। আলটিমেটলি, হলটা কি? পুরো ৭৪% মালিকানা চলে গেল আদানির হাতে। এর সঙ্গেই আদানি হয়ে গেলেন ভারতের সবথেকে বড় এয়ারপোর্ট অপারেটর। তবে আদানির এই এয়ারপোর্ট অপারেট করাটা সরকার আরও বেশি সহজ করে দিল কিছু নিয়মে বদল এনে।
১। এয়ারপোর্ট অপারেট করার জন্য অতীতের অভিজ্ঞতা না-থাকলেও চলবে।
২। একটি কোম্পানি একের বেশি এয়ারপোর্ট নিজেদের হাতে নিতে পারে।
৩। লিজ এক্সটেন্ড করা হচে ৩০ বছর থেকে ৫০ বছর পর্যন্ত।
৪। কেন্দ্রীয় সরকার কোনরকম শেয়ার পারসেন্টেজ নেবে না, শুধু ফিক্সড বেসিক ফি দিলেই হবে।
আদানির জন্য এটা সুবর্ণ সুযোগ ছাড়া কিই বা বলবেন? এখানেই একটা ব্যপার। এইসব কিছুকে বাদ দিলে আদানি গ্রুপ শুধু এয়ারপোর্টের টেকওভার করেই নয়- কোল সেক্টর, সিমেন্ট সেক্টর, রিনিউয়েবল এনার্জি-র মত একের পর এক সেক্টরে আদানি গ্রুপ মাস্টারস্ট্রোক দিয়েই চলেছে। আর এখন এনডিটিভির মালিকানা হাতে নিয়ে মিডিয়া সেক্টরেও নিজের কামড় বসিয়ে ফেলেছেন মিঃ আদানি। তবে শুধু দেশের মধ্যে নয়। ইজরায়েলের হাইফা পোর্ট রয়েছে আদানির হাতে, এখন অস্ট্রেলিয়ার সবথেকে বড় থার্মাল কোল মাইন নিজেদের হাতে নিতে চলেছে আদানি। মরক্কোয় সবথেকে বড় রিনিউয়েবল এনার্জি প্রোজেক্ট চলছে, সেটা কমপ্লিট হলে আদানি হবে ইউরোপের সবচেয়ে বড় গ্রিন হাইড্রোজেন সাপ্লায়ার।
ভারত সরকার এখন নিজের দেশের এভিয়েশন মার্কেটকে বিশ্বের থার্ড লারজেস্ট এভিয়েশন মার্কেট তৈরি করতে চাইছে। সত্যি বলতে কয়েক বছরের মধ্যে এই এভিয়েশন সেক্টরই তাঁকে দুর্দান্ত রেভিনিউ জেনারেট করতে সাহায্য করছে। আদানির এই বিজনেস এক্সপ্যানশন তো ঠিকই আছে। কিন্তু ভয় অন্য জায়গায়। সত্যি বলতে গেলে আদানির এই পুরো ব্যবসা চলছে ধারের অঙ্কে। দেখা গিয়েছে আদানির ঘাড়ে ধারের বোঝা রয়েছে ২ লক্ষ কোটি টাকা। আর দ্বিতীয় পয়েন্ট হল, আদানি যে যে সেক্টরে নিজের মাস্টারস্ট্রোক দেখিয়েছে, সেই সেক্টরে আদানির পূর্ব অভিজ্ঞতা তেমন শক্তপোক্ত নয়। স্বাভাবিকভাবেই অনেকে মনে করছেন, কোনভাবে যদি আদানি ফেল করেন তাহলে ইন্ডিয়ান ইকোনমির জন্য সেটা বেশ ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তবে, লেটস হোপ ফর দ্য বেস্ট। আশা করা যায়, আদানি গ্রুপ যেভাবে নিজের বিজনেসকে এক্সপ্যান্ড করছেন তাতে আখেরে লাভ হবে দেশের অর্থনীতির। কর্মসংস্থান হবে আরও অনেক মানুষের। কি বলেন আপনি?
বিজনেস প্রাইম নিউজ।
জীবন হোক অর্থবহ