Daily
ভাবতে পারেন, সেই ১৯০১ নাগাদ এক বঙ্গললনা একটি নয়, দু দুটি রয়েল বেংগল টাইগারের খাঁচায় কোনরকম অস্ত্র তো দূরের কথা এক গাছি ছড়িও না নিয়ে অবলীলায় ঢুকে পড়ছেন এবং তাদের সঙ্গে নানা রকম খেলা দেখাচ্ছেন। তাকিয়া করে এক জনের ওপর হেলান দিয়ে বসে আছেন। বাংলার গর্ব, শ্রী প্রিয়নাথ বসুর ‘Great Bengal Circus’-এ এই সব কিছুই সম্ভব ছিল। সময়টা নব্বইয়ের দশক। শীতের দুপুরে আলতো রোদে বসে কমলালেবুর শেষ কোয়া খেতে খেতে সার্কাস যাওয়ার প্ল্যান করছে কচিকাঁচারা। দিন বদলেছে। বদলেছে বিনোদনের মাধ্যম। শীতের দুপুরে কম্বল মুড়ি দিয়ে বসে ওয়েব সিরিজ দেখাই এখন ট্রেন্ড। আর সার্কাস এখন নস্টালজিয়া।
একটা সময় ছিল, যখন সারা দেশের সার্কাসের দল তাঁবু ফেলত কোলকাতার পার্কসার্কাস, টালা পার্ক কিংবা সিঁথির মোড়ের মাঠে। রঙিন তাঁবু আর ঝলমলে আলোয় সেজে থাকত ডিসেম্বরের শহর। এখন অবশ্য নিত্যনতুন ওটিটি প্ল্যাটফর্মের দৌরাত্ম্য চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে সার্কাস ইন্ডাস্ট্রির দিকে। আর কফিনে শেষ পেরেকটি পুঁতেছে করোনা পরিস্থিতি। বিনোদনের অনান্য মাধ্যমের মাঝে এখন টিকে থাকার লড়াই চালাচ্ছে সার্কাস শিল্প। তবুও কিছু মানুষ আছেন, যারা চান বাংলার মানুষের কাছে, দেশের মানুষের কাছে পৌঁছে যাক এই সার্কাস ইন্ডাস্ট্রির গল্প। তাই দীর্ঘ ২০ বছর পর সার্কাস বসল উত্তর ২৪ পরগণা জেলার বারাসাতের পায়োনিয়ার ক্লাবের ময়দানে।
প্রতিদিন তিনটে করে শো রাখা হয়েছে সার্কাস ম্যানেজমেন্ট টিমের পক্ষ থেকে। ৭০, ১০০ এবং ১৫০ টাকার বিনিময়ে শো দেখা যাবে। টিকিটের দাম খানিকটা বেশি, ঠিক ধরেছেন। কিন্তু মাল্টিপ্লেক্সের টিকিটের থেকে বেশি কি? আর এটুকু টিকিটের দাম না রাখলে, এই সার্কাস শিল্পের সঙ্গে যুক্ত এতজন অ্যাসোসিয়েটদের পরিচালনা করা সম্ভব হবে কি?
রোজগার ছাড়া পেট চালানোর রসদ অনেকেরই থাকে না। তাই সার্কাস শিল্পীদের অনেকেরই অন্য পেশা বেছে নিতে হয়েছে। কালের নিয়মে নয়, বরং গায়ের জোরেই বদলেছে এই সার্কাস শিল্পীদের জীবন। রিং মাস্টারের চাবুকের ঘা থেকে রক্ষা পেয়েছে বাঘ, সিংহ- ঠিকই। কিন্তু সার্কাসের মূল আকর্ষণটাই অর্ধেক হয়ে গেছে।
তবু হারিয়ে যাওয়া এই শিল্পকে খড়কুটোর মতো আঁকড়ে ধরে রেখেছেন সরকারি আধিকারিক সহ সমাজের বেশ কিছু মানুষজন। আর তাদের জন্যেই হয়তো ধুঁকতে থাকা এই শিল্প কিছুটা দানাপানি পাচ্ছে। আজকের প্রজন্মের বাচ্চাদের কাছে সার্কাসের সেই চাঁপা উন্মাদনা, সেই আকর্ষণ পৌঁছে দিতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। কিন্তু সেটাই বা কতদিন?
তবে এত চেষ্টাচরিত্র শেষেও অবলুপ্তির পথে পারফরমিং আর্টের এক অনন্য ঘরানা। হারিয়ে যেতে বসেছে বাঙালির শীতকালীন নস্টালজিয়া। এভাবেই যদি চলতে থাকে, তাহলে শীতের বিকেলে রঙিন তাঁবুতে ঘাড় উঁচু করে বসে অবাক চোখে দুর্দান্ত জাগ্লারের খেলা দেখতে থাকা বাঙালি হয়তো হারিয়ে ফেলবে একটা শিল্পকে। মিথ্যে হয়ে যাবে সেই বিখ্যাত সংলাপ, “দ্য শো মাস্ট গো অন…”
বিক্রম লাহা
উত্তর ২৪ পরগণা