Story

শীতের সন্ধ্যায় যদি আপনি মেদিনীপুরের পাঁশকুড়ার ৬ নং জাতীয় সড়ক ধরে হাঁটতে থাকেন, তাহলে আপনি একটি বিরল দৃশ্যের সাক্ষী থাকবেন। আর এই বিরল দৃশ্য হয় বন্দি হবে আপনার চোখের লেন্সে। স্মৃতির মণিকোঠায়। কিংবা আপনার হাতের মুঠোফোনের লেন্সে। যা আপনি অনায়াসেই পরবর্তীতে আপনার স্ট্যাটাসে আপডেট করতে পারবেন। আর মাঝে যদি সেলফি হয়ে যায়, মন্দ কি? মাঠের পর মাঠ শুধু আলোর রোশনাই। এখন পাঁশকুড়া জুড়ে। আয়োজনের নেপথ্যে অবশ্যই চন্দ্রমল্লিকা। বিজ্ঞান, কৃষি আর বাণিজ্যিক চাহিদা এই তিন মিলে পাঁশকুড়ায় বিখ্যাত চন্দ্রমল্লিকা চাষকে নিয়ে গিয়েছে এক অন্য উচ্চতায়। আজকে সেই প্রতিবেদনই দেখুন বিজনেস প্রাইম নিউজে।
কৃষিকাজে বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সঠিকভাবে চাষ করলে একজন কৃষক স্বাভাবিকের থেকে বেশি অঙ্কের লাভের মুখ দেখতে পান। সময়, বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তি। এই তিনটি সহায় থাকলে কৃষকের শেষ হাসি অনেকটাই চওড়া হয়। তারই একেবারে জলজ্যান্ত প্রমাণ পাঁশকুড়া। যেখানে চাষ হয় চন্দ্রমল্লিকা বা ক্রিসেন্থিমামের। মূলত ক্রিসমাসের সময় এই ফুল ফোটে বলে এর নাম ক্রিসেন্থিমাম। আলো সংবেদনশীল হওয়ার কারণে এই গাছে আলো পড়লে বৃদ্ধি আটকে যায়। আর চন্দ্রমল্লিকার এই স্বভাবকেই কাজে লাগালেন কৃষকরা। পাঁশকুড়ার মহৎপুর, নারান্দা, নেকড়া, নস্করদিঘি, শিমূলহান্ডা সহ একাধিক গ্রামে পা রাখলে সন্ধ্যেবেলা এই ছবিটাই ধরা পড়বে। কিন্তু আলো জ্বালিয়ে গাছের বৃদ্ধি আটকে দেওয়ার কারণ?
হিন্দু পঞ্জিকায় পৌষ মাস হচ্ছে মল মাস। এই সময় কোন শুভ অনুষ্ঠান হয় না। তাই এই মাসে চন্দ্রমল্লিকা চাষ করলে আখেরে ক্ষতি হবে কৃষকদেরই। এখন আলো ফেলে যদি গাছের বৃদ্ধি আটকে দেওয়া যায়। আর এক মাস সময় যদি পিছিয়ে দেওয়া যায়। তাহলে মাঘ মাস থেকে হিন্দু বাঙালিদের সকল অনুষ্ঠান ফের শুরু হয়ে যায়। স্বাভাবিকভাবেই চাহিদা বাড়ে ফুলের। তাই বৃদ্ধি আটকে সময় মেনে চন্দ্রমল্লিকা চাষ করছেন পাঁশকুড়ার ফুলচাষিরা। লাভের অঙ্কটাও ভালো থাকে ফুলচাষিদের। সবথেকে বড় কথা কী জানেন? এইভাবে চাষপদ্ধতি কিন্তু কৃষকরা জানতে পেরেছেন তাঁদের অজান্তেই। কিভাবে? শুনুন।
প্রথম যখন এই বিষয়টি ফুল চাষিদের নজরে আসে তখন তাঁরাও কিছুটা অজ্ঞাতে ছিলেন। অবশেষে সমাধানের পথ খুঁজতে তাঁরা পরামর্শ নেন কৃষি আধিকারিক সহ বিধান চন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যক্ষদের সঙ্গে। তারপরেই কৃষকদের কাছে বিষয়টি বেশ বোধগম্য হয়। এই বিষয়ে বিজনেস প্রাইম নিউজকে বিস্তারিত জানালেন শস্যসুরক্ষা বিভাগের সহ কৃষি অধিকর্তা ডাঃ মৃণাল কান্তি বেরা।
তবে সব ফুলেই যে এভাবে আলো ফেলতে হবে তার কোন মানে নেই। তাই বিশেষ কিছু প্রজাতির ফুলের জন্যই জ্বালানো থাকে আলো। কী কী? শুনে নেওয়া যাক ফুলচাষি দেবেন্দ্র নাথ জানার মুখ থেকেই।
অজান্তে কৃষকরা যে এভাবে চন্দ্রমল্লিকার এই রহস্যটি জেনে ফেলবেন তা আদপে ফুলচাষিদের কাছে বেশ কৌতূহল, উৎসাহ তৈরি করিয়েছে। কৃষি বিজ্ঞানীদের পরামর্শ নিয়ে একপ্রকার চাযে বিপ্লব ঘটিয়েছেন মহৎপুরের চন্দ্রমল্লিকা চাষিরা। মহৎপুর ছাড়িয়ে এখন একাধিক গ্রাম বা পার্শ্ববর্তী ব্লকের কৃষকেরাও এই পদ্ধতি ব্যবহার করছেন। এখন এই দৃশ্য দেখতে মানুষের ভিড় জমে পাঁশকুড়া এলাকায়। বর্তমানে পাঁশকুড়ার চন্দ্রমল্লিকা ফুল রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত ছাড়াও নেপাল, ভূটান সহ বিদেশের মাটিতেও পাড়ি দিচ্ছে। সময় এবং বিজ্ঞানকে হাতিয়ার করে রাজ্যের মধ্যে চন্দ্রমল্লিকা চাষে মডেল হয়ে উঠেছে মেদিনীপুরের পাঁশকুড়া।
প্রসূন ব্যানার্জী
পূর্ব মেদিনীপুর