Daily
বাঙালির নাকি পায়ের তলায় সর্ষে। শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা- দীপুদা-ই ভরসা। বছরে কমকরে দুবার বাক্স প্যাঁটরা গুছিয়ে পরিবারের সঙ্গে ঘুরে আসেন পাহাড়, জঙ্গল অথবা সমুদ্র। আর শীতকালে দু চার দিন এক্সট্রা ছুটি পেলে বাঙালির ভ্রমণ পিপাসা যেন কয়েকগুন বেড়ে যায়। তাই দীপুদা’কে পাশে রেখেই প্ল্যান করে ফেলেন সিমলা, কুলু মানালি কিংবা উত্তর-পূর্ব ভারত। আর আজ তাই সুযোগ পেয়েই আমরাও বেরিয়ে পরেছিলাম উত্তর পূর্ব ভারতের শিলং-এর উদ্দেশ্যে। যদিও শিলং ঘোরার বেস্ট টাইমিং জুলাই-অগাস্ট নাগাদ, তবুও বাঙালি কি কোনোদিন বেড়ানোর ক্ষেত্রে কোন আইন মেনেছে? তবে আজই বা তার অন্যথা হবে কেন? তাই শিলং-এর পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথেই দেখা হল প্রচুর ভ্রমণপিপাসু বাঙালির সঙ্গে।
শিলং, প্রাচ্যের স্কটল্যান্ড। সমুদ্রপৃষ্ট থেকে প্রায় ৪৯০৮ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত পাহাড়ি সাম্রাজ্য। হাওড়া স্টেশন থেকে সরাইঘাট এক্সপ্রেসে চেপে শুরু হল আমাদের গৌহাটি যাত্রা। এরপর গৌহাটি জংশনে নেমে গাড়ি ভাড়া করে সোজা মেঘালয়ের রাজধানী শিলং। চেরাপুঞ্জি মানেই বৃষ্টি- ছোটবেলার পাঠ্য বইতে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা থাকে এই তথ্য। তাই প্রত্যেকের লাগেজে আর কিছু থাকুক বা না থাকুক, একটা করে ছাতা ছিলই। কিন্তু আমাদের কপাল ভালো যে, একেবারে ঝকঝকে আবহাওয়া ছিল সেখানে। গাড়ি থেকে হাত বাড়ালেই যেন ছোঁয়া যাচ্ছে তুলোর মতো মেঘগুলো। সবুজ গালিচা বিছানো উপত্যকা আর পাহাড়ি ঝর্ণার সফেন ফেনা যেন শিলংকে করে তুলেছে স্বর্গের মত সুন্দর। সকালে তাপমাত্রা ১০-১১ ডিগ্রীর কাছাকাছি থাকলেও রাতে নেমে আছে ৫-৬ ডিগ্রীতে। আর এই কনকনে শীতকেও বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে পাহাড়ি প্রকৃতিকে দেদার উপভোগ করছেন পর্যটকেরা। পাহাড়ি পথ বেয়ে যতই এগিয়ে চলছে গাড়ি, ততই যেন সৌন্দর্যের গভীরতা বাড়ছে। চলতি পথে গাড়ি থামিয়ে কেউ সেলফি তুলছেন, কেউ আবার রিলস বানাচ্ছেন। এমন সুন্দর পরিবেশ আর আবহাওয়া পেলে কে আর মিস করে বলুন!
কোথায় যাবেন?
একদিন শিলং-এ রেস্ট নিয়ে পরদিন ফের বেরিয়ে পড়া। এবার গন্তব্য চেরাপুঞ্জি। একদম সক্কাল সক্কাল ব্রেকফাস্ট সেরেই বেরিয়ে পড়লাম আমরা। জানলার কাঁচটা আলতো খোলা। কপাল ছুঁয়ে যাচ্ছে পাহাড়ের শীতল হাওয়া। ক্লান্তিকে দূরে ঠেলে এগিয়ে চলেছে গাড়ি। পাহাড়ি সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে কখন যে হারিয়ে যাবেন আপনি, বুঝতেই পারবেন না। ঘণ্টাখানেক বাদে চাকা থামল। আমরা পৌঁছলাম মকডক ভ্যালিতে। শিলং-এর পর্যটন মানচিত্রে থাকা অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান। আধঘণ্টা সেখানে দাঁড়িয়ে বেরিয়ে পড়লাম আবার। মকডক ভ্যালি অতিক্রম করে গাড়ি এগিয়ে চলল এলিফ্যান্ট ফলস, উমিয়াম লেক, ওয়াকাবা ফলস, নোকালিকাই ফলস, ইকো পার্ক, সেভেন সিস্টার ফলস, রামকৃষ্ণ মিশনের উদ্দেশ্যে। এছাড়াও শিলং গেলে কিন্তু মাওলিনং ভিলেজ যাওয়াটা মিস করবেন না। এটি এশিয়ার সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন গ্রাম। আর এখানকার মানুষের জীবনশৈলী আপনাকে অনুপ্রাণিত করবেই। একদিকে পাহাড়ের অপরুপ সৌন্দর্য আর অন্যদিকে পাহাড়ি গন্ধ মাখানো গুহা। গুহাপথে অনেকটাই প্রবেশ করা যায়। তবে এসব জায়গায় ঢুকতে কোথাও কোথাও আপনাকে প্রবেশমূল্য দিতে হতে পারে। তবে সেটা ৫০ টাকার বেশি নয়। চলতি পথেই দেখা হল বেশ কিছু ভ্রমণপ্রিয় বাঙালির সাথে। অচেনা জায়গায় চেনা মানুষের সাথে দেখা হলে কথা বলতে মন চায়।
এখানকার অর্থনীতি মূলত পর্যটন নির্ভর। বছরে পর্যটকদের ভিড়ই বলে দেয় সে বছর শিলং-এর মানুষজন কেমন থাকবে। পথের দুই ধারে প্রচুর দোকান আর হোটেল। রয়েছে প্রচুর হোম স্টেও। কাজেই আপনি চাইলে হোটেল বুকিংও করতে পারেন অথবা নিজের মত থাকতে হলে হোম স্টেও বুকিং করতে পারেন। তবে অন্তত এক মাস আগে বুক করলে ভালো। ডিসকাউন্ট পাওয়া যায় কিন্তু। মোমো বা ম্যাগির দোকান বাদেও রয়েছে দারুচিনি, তেজপাতা, ভুট্টা, শীতের পোশাকের প্রচুর দোকান। ঘুরতে আসলে শপিং করাটাও মাস্ট। তবে যদি মনভরে কেনাকাটা করার থাকে, তাহলে শিলং-এর পুলিশ বাজার থেকে কেনাকাটা করা ভালো।
সবমিলিয়ে শিলং-এর নৈসর্গিক সৌন্দর্য মুগ্ধ করবে আপনাকে। যতই ঘুরবেন, পিপাসা যেন মেটার নয়। আর তাই তো প্রাচ্যের স্কটল্যান্ডে অন্তত একবার হলেও ঘুরতে যাওয়ার বাসনা থাকে পর্যটকদের। তবে, সেরকম ইচ্ছে থাকলে শীতের ছুটিতে প্ল্যানটা বানিয়ে ফেলতে পারেন কিন্তু। আর যাই হোক, হতাশ হবেন না। পাহাড়ি সৌন্দর্য আপনাকে লাইফটাইম এক্সপেরিয়েন্স করাবে।
প্রসূন ব্যানার্জি