Story
যাই বলুন না কেন, ভোগের খিচুড়ির স্বাদ- যাকে বাদ দেওয়া কোনভাবেই সম্ভব হয় না। আর শুধু পুজো পার্বণের মধ্যেই বা বিষয়টা সীমাবদ্ধ রাখা কেন? সুগন্ধি ভাত, খিচুড়ি যে কোন অনুষ্ঠানে আজও স্বাদে মাতিয়ে রাখে আম বাঙালিকে। আর পায়েস, পিঠে বা বিরিয়ানি হলে তো কথাই নেই। তাই ছোট দানা, মাঝারি দানার সুগন্ধি চালের বিশেষ চাহিদা সবসময় থেকে যায়। ফলে জাতীয় স্তরে তো বটেই এমনকি আন্তর্জাতিক স্তরে বাণিজ্যিকভাবে এই চালের চাহিদা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেই বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। কিরকম, সেটাই দেখাতে চলেছি আজকের প্রতিবেদনে।
দক্ষিণবঙ্গের বেশ কয়েকটি জেলায় চাষ হচ্ছে গোবিন্দভোগ। উত্তরবঙ্গে চাষ হচ্ছে তুলাইপাঞ্জি। ২০০৯ সাল থেকে এই বিষয়ে ভালোরকম সাহায্য করছে বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রীয় কৃষি বিকাশ যোজনা। তবে শুধু এই দুটো চালই নয়। আরও বেশ কিছু সুগন্ধি চালের চাষ করছেন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কৃষকরা। তার জন্য কৃষকদের সবদিক থেকে সাহায্য করছে বিসিকেভি। প্রত্যেক বছরের মতন ২০২৩ সালে কৃষকবন্ধুদের সুগন্ধি চালের বীজ দেওয়া হয়েছে। সেগুলো কী কী?
বর্তমানে দক্ষিণবঙ্গে ৩৬ হাজার থেকে ৩৮ হাজার হেক্টর জমিতে গোবিন্দ ভোগ, আর উত্তরবঙ্গে ৮ হাজার হেক্টর জমিতে তুলাইপাঞ্জির চাষ হচ্ছে। বর্তমানে গোবিন্দভোগ চাষের এলাকা বর্ধমান, হুগলি, নদীয়া, বাঁকুড়া, বীরভূম, মুর্শিদাবাদ, উত্তর ২৪ পরগনা আর তুলাইপাঞ্জির চাষ হচ্ছে দক্ষিণ দিনাজপুর এবং উত্তর দিনাজপুর জেলায়। উল্লেখ্য আমাদের রাজ্যে প্রায় ৫ হাজার প্রজাতির ধান চাষ হতো, বিভিন্ন কারণে তার বেশিরভাগটা লুপ্ত হয়ে বর্তমানে ১০০ থেকে ১৫০ দেশি প্রজাতির ধান কৃষক ও বিজ্ঞানীদের প্রচেষ্টায় আজও সুরক্ষিত আছে। আর জলবায়ুর মেজাজ বদল আজকের দিনে মেজর প্রবলেম। তাই জলবায়ুর কথা মাথায় রেখে কিভাবে সুগন্ধি ধানের গুণগত মান বজায় রাখা যায়, সেটাও একটা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। আর সেটাই নয়। সুগন্ধি ধানের চাষ থেকে শুরু করে কিভাবে একেবারে বিক্রি পর্যন্ত করা সম্ভব- সেই বিষয়েও কৃষকদের একটা প্রশিক্ষণের প্রয়োজন পড়ে।
আর এই সার্বিক লক্ষ্যকে সামনে রেখেই বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও উত্তরবঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে দক্ষিণবঙ্গের আটটি জেলার এবং উত্তরবঙ্গে একটি জেলার ৬২ জন কৃষক, ছটি কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্রের বিজ্ঞানীদের নিয়ে আয়োজিত হলো বাংলার সুগন্ধি ধানের উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ ও বিপণন বিষয়ক কৃষি প্রশিক্ষণ ও আলোচনা। সেমিনারে উপস্থিত কৃষকদের মধ্যে একজন কথা বললেন বিজনেস প্রাইম নিউজের সঙ্গে। তাঁর নাম শেখ আজাদ হোসেন। তিনি চাষ করছেন গোবিন্দভোগ। খরচ কম, আয় বেশি। তাই ভবিষ্যতে আরও সম্প্রসারণের প্রচেষ্টা রয়েছে কৃষকের।
এখানেই একটা বিষয় জানিয়ে রাখি। ২০১৭ সালের ২৪ অক্টোবর গোবিন্দভোগ, তুলাইপাঞ্জি চালের জিআই হিসাবে নিবন্ধিকৃত হয়। তাই এখন সমস্ত বাধা অতিক্রম করে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাওয়া। উৎপাদন থেকে বিপনন- এই পুরো বিষয়টা প্রপারলি যাতে হয় তার জন্য কৃষকবন্ধুদের ভালোরকম প্রশিক্ষণের প্রয়োজন পড়ে। আর সেই সুবাদে আজ সেমিনারের মাধ্যমে কৃষকবন্ধুদের কাছে পৌঁছে যাওয়া। তাঁদের সঙ্গে গোটা বিষয়টা নিয়ে চলে আলোচনা। দিনের শেষে কৃষকদের পরিশ্রম যাতে মাঠে না মারা যায়।
মাঝেমধ্যেই শোনা যায়, লাভের পরিমাণ বেশি না থাকায় আজকের প্রজন্ম সেভাবে চাষবাসের দিকে ঝুঁকতে চাইছেন না। সেটা অবশ্যই অ্যালারমিং। এমনিতেই আগে যেখানে ৫ হাজার প্রজাতির ধান চাষ হত, আজ সেটা কমে দাঁড়িয়েছে ১০০ থেকে ১৫০ প্রজাতি মত। সেটা চাষবাসের ক্ষেত্রে অশনি সংকেত নিয়ে আসতে পারে। বর্তমানে দক্ষিণবঙ্গে সুগন্ধি ধান চাষে যুক্ত কৃষকদের সংখ্যা ৯০ হাজার থেকে প্রায় ১ লক্ষ। তাই এই সংখ্যক কৃষকদের প্রশিক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে। যাতে তাঁরা আরও বিপুল পরিমাণ চাষ করতে পারেন। দিনের শেষে লাভবান হবেন এই কৃষকরাই। সেদিনের এই সেমিনারে তুলে ধরা হয় গোটা বিষয়টা- কৃষকদের সামনে। ৬টি কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্রের বিজ্ঞানী সহ ৬২ জন কৃষক উপস্থিত ছিলেন এই সেমিনারে। খেয়াল রাখবেন, সুগন্ধি চালের চাষ না হলে বাঙালির এই প্রিয় খাবারগুলি আর পাতে উঠবে না। তাই আফসোসের জায়গা নেই। বরং কৃষি বিজ্ঞানীদের নিরন্তর প্রচেষ্টা চলতে থাকুক। আর কৃষকবন্ধুরা চাষ করে লাভের অঙ্ক বাড়িয়ে তুলুন। আজকের প্রতিবেদন এতটাই। লাইক করুন, শেয়ার করুন আর নতুন হলে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের চ্যানেল বিজনেস প্রাইম নিউজ।
সুব্রত সরকার
নদীয়া