Story
কথায় আছে ধানের মাঠে ওল নামাতে নেই। বাংলার এই প্রবাদটি অন্তত দক্ষিণবঙ্গের বীরভূম, আর পশ্চিম বর্ধমানে এসে বড়োই বেমানান হয়ে পড়েছে। এখানে ধানের মাঠেই কন্দ জাতীয় ফসল একাঙ্গী চাষ করে লাভের মুখ দেখছেন জেলার বহু কৃষক। তাই ধান চাষে ফকির হওয়া থেকে কৃষি বিজ্ঞানীদের পরামর্শে রাতারাতি আমির হয়ে উঠেছেন এখানকার বহু কৃষক এই একাঙ্গীকে ভর করেই।
পশ্চিমবঙ্গের প্রধান ফসল ধান হলেও সব জায়গায় এখনও ধান চাষ অনুকূল পরিবেশ না থাকায় দক্ষিণবঙ্গের সুখা জেলা গুলিতে বিশেষ করে পশ্চিম বর্ধমান, বীরভূম চাষিদের কাছে ধান চাষ আর তেমন লাভজনক ছিল না। সেই সময় চাষিদের পাশে এসে দাঁড়ান বীরভূম জেলার কৃষি বিজ্ঞানের পীঠস্থান রথীন্দ্র কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্রের কৃষি বিজ্ঞানী।
যে সমস্ত জমিতে, সারাবছর জল ধরণের ক্ষমতা নেই বললেই চলে, সেই জমিগুলিতে ধান চাষ করলেও ধানের ফলনের মান খুব একটা ভালো হয় না। ফলন ভালো না হলে, কৃষক দামও পায় না। লোকসান আর দুশ্চিন্তার বোঝা যখন পশ্চিম বর্ধমান ও বীরভূমের বহু কৃষককে অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছিল তখন কৃষকদের সামনে দিগন্ত খুলে যায় একাঙ্গী চাষে। খুব অল্প সময়ে বিনা পরিচর্যায় সামান্য জৈব সার যেমন কেঁচো সার ব্যবহার করলে, ফলন ভালো হয় বলে বাহারি কৃষক দামও পান অনেক বেশি। সবথেকে বড় কথা একাঙ্গী বিক্রি করতে কৃষককে কোথাও যেতে হয় না। একেবারে মাঠ থেকেই কৃষকের এই ফসল বিক্রি হয়ে যায়। জেলার প্রথম একাঙ্গী চাষি সুবোধ ঘোষই প্রথম জানালেন ধান আর একাঙ্গীর তারতম্যের কথা।
শুধু সুবোধ ঘোষই নয়, বোলপুরের চাষি সুভাষ ঘোষও এই কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্রের সহযোগিতায় ধান চাষ ছেড়ে দিয়ে আজ হয়ে উঠেছেন একাঙ্গী চাষি। বিঘের পর বিঘে জমিতে আগাছার ফাঁক-ফোকর দিয়ে উঁকি মারছে শুধুই ছোট ছোট সবুজ পাতা। দূর থেকে দেখলে ঝোপঝাড় মনে হলেও এটাই হলো এখানকার কৃষকদের বলা ভালো রাজ্যের অন্যতম অর্থকরী ফসল একাঙ্গী।
রথীন্দ্র কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা যখন চাষীদেরকে বোঝাতে ব্যস্ত ছিলেন এই একাঙ্গী চাষ করতে, তখন অধিকাংশ কৃষকরা কৃষি বিজ্ঞানীদের কথা শোনেননি। তারা ব্যস্ত ছিলেন সেই প্রচলিত শস্য চাষে। কিন্তু আজ সুভাষ ঘোষ, সুবোধ ঘোষদের উন্নতি দেখে জেলার অধিকাংশ জায়গায় শুরু হয়েছে একাঙ্গী চাষের তোড়জোড়।
তবে ধান আর একাঙ্গীর মধ্যে লাভের ফারাকটা যেমন আজ চাষিরা বুঝছেন তাই আজ অধিকাংশ চাষিরা এই চাষে সামিল হয়েছেন।
আর বিক্রির বিষয়েও ভাবতে হয় না চাষীদেরকে। ব্যপারীরা একেবারে ক্ষেতের থেকে এসে ফলন তুলে নিয়ে যান। একে ঔষুধি গাছ, তার উপর কম খরচে লাভজনক শস্য। এই দুইয়ে মিলে একাঙ্গীকে বেশ জনপ্রিয় করেছে দক্ষিণবঙ্গের এই জেলাগুলিতে।
তাই জেলার অধিকাংশ চাষি আজ মেতেছেন একাঙ্গী চাষে। ক্ষেতে না লাগছে জলসেচ, না লাগছে শ্যালো ওয়াটার। সামান্য জৈব সার, বৈশাখ জ্যৈষ্ঠের সামান্য বৃষ্টি। আর বৃষ্টিতেই ফলে ভরে ওঠে একাঙ্গীর ক্ষেত। কৃষি বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে রীতিমত হাতে কলমে দেখেছেন একাঙ্গী চাষের লাভজনক দিকটি বাজারগত ভাবে।
কন্দ জাতীয় উদ্ভিদ একাঙ্গীতে খুব কম খরচে সাদামাটা ভাবে চাষের খরচ না বাড়িয়েও কৃষক বেশ মোটা লাভের অঙ্ক ঘরে তুলতে পারেন। তাইতো জেলার কৃষকদের আর্থিক মানয়নের সাথে জড়িয়ে রয়েছে রথীন্দ্র কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্রের বিজ্ঞানীদের হাতযশ আর সদর্থক প্রচেষ্টাই।
মানিক দাস, বর্ধমান