Tourism
দীর্ঘ ২৮ বছরের খরা কাটল। অবশেষে বিশ্বকাপ ঘরে এনে দিলেন মারাদোনার যোগ্য উত্তরসূরি লিওনেল মেসি। ফুটবল জগতের বিস্ময় খেলোয়াড়। যার পায়ের জাদুতে মাত গোটা বিশ্ব। একইসঙ্গে ফুটবল বিশ্বকাপে রাজকীয় অধ্যায় রচনা করল আর্জেন্টিনা। দক্ষিণ আমেরিকার একটি দেশ। যে দেশের জীবন যাত্রার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে শুধু ফুটবল। কিন্তু আর্জেন্টিনার পরিচয় শুধু ফুটবল দিয়ে নয়। এই দেশের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বেশ কিছু না-জানা কথা। যেমন এই দেশের নাম কেন আর্জেন্টিনা রাখা হয়েছে? আর্জেন্টিনার একটি শহরে বাচ্চাদের নাম মেসি রাখার কারণে প্রশাসন কি কঠিন পদক্ষেপ নিয়েছিল? আর্জেন্টিনার জাতীয় খেলা ফুটবল নয়, তাহলে সে খেলার নাম কি আর এই দেশের অর্থনীতির হালহকিকতই বা কেমন? দেখুন, বিশ্বকাপ শেষের কয়েক ঘন্টা কেটে গেলেও বিশ্ববাসী এখনো মেসি জ্বরে আক্রান্ত। তাই মেসির দেশ নিয়ে অজানা কথা আপনাদের সঙ্গে শেয়ার না-করলে হয়? তাই আজ আপনাদের সামনে যে প্রতিবেদন তুলে ধরব, তার নাম আর্জেন্টিনার অজানা অর্থনীতি। স্বাগতম বিজনেস প্রাইম নিউজে। আর্জেন্টিনা সম্পর্কে জানতে হলে চোখ থাকুক একেবারে শেষ পর্যন্ত।
দক্ষিণ আমেরিকায় অবস্থিত আর্জেন্টিনা বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম শক্তিশালী দেশ হিসেবে নিজের জায়গা পাকা করে নিয়েছে। প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ব্রাজিলের সঙ্গে চালিয়ে যাচ্ছে ফুটবলের প্রতিদ্বন্দিতা। এই দেশে এতটা বেশি ফুটবল উন্মাদনা রয়েছে যে মনে করা হয়, দেশটিতে পড়াশোনা করানোর পাশাপাশি এখানে ফুটবল চর্চা এক নিত্য অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। মারাদোনা, মেসির দেশে সেটা হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় হল, যে দেশ এমন ফুটবল পাগল, সেই দেশের জাতীয় খেলা ফুটবল নয়। এই দেশের ন্যাশনাল গেম হচ্ছে পাতো। ঘোড়ার পিঠে চেপে হ্যান্ডবল খেলা হল এই পাতো। তবে এই খেলার জনপ্রিয়তা ফুটবলের ধারেকাছেও পৌঁছতে পারে না। আমরা সকলেই জানি, রুপোর লাতিন নাম হল আর্জেন্টাইন। বলা হয়, একটা সময় এই দেশে রুপোর ভাণ্ডার ছিল। সেখান থেকেই দেশের নাম হয় আর্জেন্টিনা। পৃথিবীর একমাত্র দেশ, যে দেশের নাম রাখা হয়েছে ধাতু দিয়ে। অবশ্য এই নাম কে বা কারা করে থাকেন? তার জন্য পিছিয়ে যেতে হবে আর্জেন্টিনার ইতিহাসে। তার আগে আর্জেন্টিনার ভৌগলিক অবস্থানটা একবার পরিষ্কার করে নেওয়া যাক।
আর্জেন্টিনার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থান করছে ব্রাজিল। উত্তরে অবস্থিত বলিভিয়া, প্যারাগুয়ে। পশ্চিমে রয়েছে চিলি এবং দক্ষিণে আটলান্টিক মহাসাগর। এছাড়া এই দেশের মধ্যেই রয়েছে সুবিখ্যাত আন্দিজ পর্বতমালা, যার উচ্চতম শৃঙ্গের নাম আকোনকাগুয়া। আর্জেন্টিনা সবদিক থেকেই প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যে ভরপুর একটি দেশ। সমুদ্র, পর্বত এবং ঘন অরণ্যে ঘেরা দেশটির রাজধানী বুয়েনোস আইরেস। বিখ্যাত পম্পাস তৃণভূমি রয়েছে এই আর্জেন্টিনাতেই। দেশের অধিকাংশ মানুষ বসবাস করেন এখানেই। আর কাউবয়দের ঘরবাড়িও বলতে গেলে এই পম্পাস তৃণভূমি। ধনসম্পদে ভরপুর এই দেশটি একটা সময় ছিল যখন ব্যবসা, বাণিজ্যের হাব হয়ে উঠেছিল। ষোড়শ শতকের দিকে স্পেনীয় উপনিবেশের হাত ধরে আধুনিক আর্জেন্টিনার ইতিহাস লেখা শুরু হয়। সেই সময় ইয়োরোপের বহু মানুষ এই দেশে আসতেন ব্যবসা-বাণিজ্যের আশায়। ১৮১০ সালে আর্জেন্টিনা স্পেনের হাত থেকে নিজেদের স্বাধীনতা ছিনিয়ে নেয়। কিন্তু তারপর আর্জেন্টিনায় বেশ কয়েকটি গৃহযুদ্ধ হয়েছিল। অবশেষে মডার্ন আর্জেন্টিনার সূত্রপাত হয় একেবারে অন্যভাবে। মূলত কৃষিকাজের দিকে আর্জেন্টিনা ঝাঁপিয়ে পড়ে। ভুট্টা, গম বা সয়াবিনের মত কৃষিপণ্য উৎপাদন করে বিদেশে রফতানি করে নিজেদের কৃষি অর্থনীতিকে মজবুত করেছে আর্জেন্টিনা। এছাড়াও গরুর মাংস উৎপাদনে আর্জেন্টিনা রয়েছে একেবারে প্রথম সারিতে। তবে আর্জেন্টিনার অর্থনীতির হাল কে ধরেছে যদি জানতেই হয় তাহলে বলতে হবে ফুড প্রসেসিং, মোটর ভেহিকলস অ্যান্ড অটো পার্টস, ইলেকট্রনিক্স, মেশিনারি ইকুইপমেন্ট, কেমিক্যাল, ফার্মাসিউটিকালস, গ্লাস, স্টিল, অ্যালুমিনিয়াম, টেক্সটাইল, সিমেন্ট, তামাকজাত পণ্য, ফার্নিচার এবং লেদার ইন্ডাস্ট্রি আর্জেন্টিনার অর্থনীতির হাল সচল রেখেছে। এছাড়াও দেশটি জিঙ্ক, কপার, বোরন এবং লেড উৎপাদনে এগিয়ে রয়েছে বিশ্বের অন্যান্য দেশের থেকে অনেকখানি। কিন্তু অদ্ভুত ব্যপার, আজ এই দেশে রুপোর উৎপাদন কিন্তু নেমে গিয়েছে একেবারে তলানিতে।
আর্জেন্টিনা যে দেশগুলোর সঙ্গে সবচেয়ে বেশি ব্যবসা করে, সেটা হল ব্রাজিল। আর্জেন্টিনার ব্যবসার ১৬% হয়ে থাকে এই দেশটির সঙ্গে। এছাড়াও রয়েছে চিন, আমেরিকা এবং চিলি। এই তিনটি দেশের সঙ্গে আর্জেন্টিনার আমদানি-রফতানির সম্পর্ক খুব গভীর। তবে এই দেশগুলো ছাড়াও আর্জেন্টিনা আমদানিতে ইউরোপের যে দেশটির ওপর নির্ভর করে, সেটা হচ্ছে জার্মানি। বলা বাহুল্য, দক্ষিণ আমেরিকায় আর্জেন্টিনার অর্থনীতির অবস্থান ব্রাজিলের পরেই। তবে এখানেই একটা বিষয়। আর্জেন্টিনার অর্থনীতি শুধুমাত্র এই পণ্য আমদানি-রফতানির ওপরেই নির্ভর নয়। আর্জেন্টিনার অর্থনীতির অন্যতম স্তম্ভ এই দেশের ট্যুরিজম।
১। ইগুয়াজু ফলসঃ
ইগুয়াজু ফলস অবস্থিত ব্রাজিল এবং আর্জেন্টিনার বর্ডারে। আর্জেন্টিনায় অবস্থিত ইগুয়াজু ন্যাশনাল পার্ক বর্তমানে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের অন্তর্গত। এই জলপ্রপাতটি ১৫০-৩০০টি ছোট ছোট জলপ্রপাতের সমষ্টি। প্রায় ৮২ মিটার চওড়া এই জলপ্রপাতের সর্বশেষ অংশটিকে বলা হয় ডেভিল’স থ্রোট। শুধু আর্জেন্টিনা বলে নয়। এটি দক্ষিণ আমেরিকার অন্যতম জনপ্রিয় টুরিস্ট প্লেস। যেখানে প্রতি বছর ভিড় জমান বহু পর্যটক।
২। পেরিতো মোরেনো গ্লেসিয়ারঃ
প্রায় ৩০ কিমি দীর্ঘ এই গ্লেসিয়ারটি বিশ্বের তৃতীয় বৃহৎ ফ্রেশ ওয়াটার রিজার্ভ। এই গ্লেসিয়ারে ওঠা যায়, আইস ট্রেকিং করা যায়, এমনকি ৫ ঘন্টার ছোটখাটো এক্সকার্সন সেরে নেওয়া যায়। বহু পর্যটকদের ভিড় জমে এই গ্লেসিয়ারের অনৈসর্গিক দৃশ্য উপভোগ করার জন্য। এর সঙ্গেই রয়েছে লস গ্লেসিয়ারস ন্যাশনাল পার্ক। এই পার্কে রয়েছে ৩,৩৫৯ মিটার উঁচু মন্ট ফিতজ রয়। অনেকেই বলেন, এই পর্বতে ওঠা নাকি এভারেস্টের থেকেও কঠিন।
৩। উশুআয়াঃ
আর্জেন্টিনার একেবারে দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত উশুআয়া। এটি হচ্ছে বিশ্বের দক্ষিণতম নগরী। কারণ তারপরেই রয়েছে অ্যান্টার্কটিকা। এই নগরীকে ঘিরে রয়েছে পাহাড়, সমুদ্র, গ্লেসিয়ার এবং অরণ্য। এখানে অবস্থিত সান হুয়ান দে সালভামেন্তো লাইটহাউজ পর্যটকদের অন্যতম পছন্দের জায়গা।
৪। লা বোকাঃ
রাজধানী বুয়েনোস আইরেসের অন্যতম রঙিন জনপদ এই লা বোকা। দক্ষিণ আমেরিকার অন্যতম আকর্ষণীয় জায়গা হল এটি। কারণ, এখানকার রং-বেরঙের বাড়ি। এছাড়াও রয়েছে কাফে, মিউজিক শোনার জায়গা, রয়েছে এখানকার বিখ্যাত ট্যাঙ্গো ডান্স। রাজধানীতে অবস্থিত লা বোকা এলাকাটি বছরভর পর্যটকদের মন টেনে রাখে।
সত্যি বলতে এখানেই শেষ নয়। এছাড়াও নয় নয় করে আরও পনেরো থেকে কুড়িটা জায়গা রয়েছে এই গোটা দেশে যেখানে পর্যটকদের দেখা আপনি পেয়ে যাবেনই যাবেন। বলা হয়, গেল বছর অর্থাৎ ২০২১ সালে শুধুমাত্র পর্যটন খাত থেকে আর্জেন্টিনা আয় করেছিল প্রায় ৩৪ বিলিয়ন ডলার। তবে এত কিছু সত্ত্বেও আজ আর্জেন্টিনার অর্থনীতি খুব যে একটা স্থিতিশীল জায়গায় রয়েছে, এমন কিন্তু বলা যাবে না। একটি রিপোর্ট থেকে জানা যাচ্ছে, ২০১৮ সালে আর্জেন্টিনার মুদ্রার ভ্যালু ডলারের নিরিখে পড়ে যায় প্রায় ৫০% মতন। ২০২০ সালে পড়ে ২৫% মতন। ২০২২ সালে পড়ে ৬৮% মতন। অতিমারি এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতা আর্জেন্টিনার ভাগ্যের চাকা খুব একটা মসৃণ গতিতে ঘোরাতে পারেনি। মনে করা হয়, এখানে আর্থিক বৈষম্য প্রকট হওয়ার জন্য অর্থনীতির ভারসাম্য কিছুটা দোলাচলে পড়ে। বর্তমানে আর্জেন্টিনা বিশ্বের ২৪ নম্বর বৃহৎ অর্থনীতির দেশ। প্রতিবেদনটি শেষ করার আগে, আরেকটা কথা। এই আর্জেন্টিনা থেকেই প্রথম ফিঙ্গার প্রিন্ট ব্যবস্থার প্রচলন শুরু হয়। আর বলা হয়, এই দেশের মানুষ এখনো যতটা সময় রেডিও-য় কাটান, পৃথিবীর আর কোন দেশ সেটা করে না। আর মেসির শহর রোজারিওতে শিশুদের নাম এত বেশি মেসি রাখা হয়েছিল যে প্রশাসন বাধ্য হয়ে কোন শিশুর নাম ‘মেসি’ রাখার ওপর জারি করেছে নিষেধাজ্ঞা। যাই হোক, এখানেই শেষ করছি আজকের প্রতিবেদন।
বিজনেস প্রাইম নিউজ।
জীবন হোক অর্থবহ।