Story
দেশ স্বাধীন হয়েছে। লাল কেল্লায় লোকে লোকারণ্য। বক্তৃতা দেবেন স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহর লাল নেহেরু। চারিদিকে আনন্দ, উচ্ছ্বাস। তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে মিষ্টি। কিন্তু কলকাতার এক বাঙালি ব্যবসায়ী আনন্দের মুহূর্ত ভাগ করে নিলেন মিষ্টির বদলে ক্রিম দিয়ে। শোনা যায়, এক লাখ ক্রিম গোটা দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে ভাগ করে দিয়েছিলেন ঐ বাঙালী ব্যবসায়ী। দেখিয়েছিলেন আত্মনির্ভর ভারতের স্বপ্ন। যাত্রা শুরু হয়েছিল সবুজ রঙের টিউবে বন্দি দেশের প্রথম অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম বোরোলিনের। এখনো পর্যন্ত যার কদর করে গোটা ভারতবাসী।
স্বাধীনতার আগে ভারতে সেইভাবে কোন ক্রিম তৈরি হত না। বিদেশ থেকে আমদানি করা ক্রিমগুলোর দাম এতটাই বেশি থাকত যে সাধারণ ভারতবাসীর কাছে সেগুলো ব্যবহার করা বিলাসিতার সমানই হত। এদিকে ১৯২৯ সালে স্বদেশী আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন গান্ধীজি। দেশকে আত্মনির্ভর করার লক্ষ্যে গান্ধীজির ডাকে সাড়াও দিয়েছেন বহু মানুষ। সেই ডাকে প্রভাবিত হলেন কলকাতার ব্যবসায়ী গৌরমোহন দত্ত। যিনি বিদেশ থেকে ক্রিম, লোশন আনিয়ে বিক্রি করতেন এদেশে। গান্ধীজির ডাক কলকাতার এই ব্যবসায়ীর মনে এতটাই প্রভাব ফেলল যে বিদেশি ক্রিমের ব্যবসা প্রায় বন্ধ করে দিয়ে নিজেই মন দিলেন ক্রিম তৈরি করতে। এমন একটি ক্রিম তৈরি করার লক্ষ্য তিনি নিয়েছিলেন যা আসমুদ্রহিমাচল ভারতবাসীর খুব কাছের হয়ে উঠবে। পথ চলা শুরু করল দেশের প্রথম অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম বোরোলিন। সবথেকে অবাক করা বিষয় হল এই ক্রিম তৈরি করার জন্য তিনি কোন এক্সপার্টের সঙ্গে বসেননি। বরং নিজের হাতে পরিবারের লোকজনদের নিয়েই তৈরি করতে শুরু করলেন এই ক্রিম। রাত্রিবেলা তৈরি করতেন। সকালবেলা গৌরমোহন দত্ত কলকাতার বিভিন্ন মার্কেটে বিক্রি করতেন। এখন যদি প্রশ্ন করেন, কেন ক্রিমের নাম বোরোলিন রাখা হল? গৌরমোহন দত্ত বোরোলিন তৈরিতে ব্যবহার করতেন বোরিক অ্যাসিড, জিঙ্ক অক্সাইড আর অ্যানহাইড্রাস লেনোসালিন। এগুলোর মধ্যে অ্যান্টিসেপটিক হিসেবে বোরিক অ্যাসিডের ভূমিকা ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বোরিক থেকে বোরো আর ওলিনের মানে অয়েল।
কলকাতায় বোরোলিনের ব্যবহার এতটাই বাড়তে শুরু করে যে সেই সময় ইংরেজদের কাছে সেটা বিশেষ ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তারা মনে করে, স্বদেশী আন্দোলনের প্রভাব যদি এভাবে পড়ে তাহলে ভারতের এমন বহু ব্যবসায়ী এগিয়ে আসবে দেশীয় প্রোডাক্ট তৈরি করতে। যা তাদের জন্য বেশ চিন্তার কারণ হয়ে উঠবে। কিন্তু সেই জমানায় তো এতো বিজ্ঞাপনের রমরমা ছিল না। তাহলে বোরোলিন নিজের ব্যবসার চাকাটা কিভাবে ঘোরাল? ঐ যে আগেই বললাম স্বাধীনতা দিবস। একদিকে চলছে বক্তৃতা। অন্যদিকে মিষ্টির জায়গায় গোটা দেশে বিতরণ করা হচ্ছে ১ লক্ষ বোরোলিন। তাঁর এই অভিনব মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি বোরোলিনকে জনপ্রিয় করল কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী। এটাই ছিল গৌরমোহন দত্তর মার্কেটিং পলিসি। সেই সময় কলকাতায় বোরোলিনের বিক্রি ছিল ৬০ শতাংশ। তারপর গোটা দেশে বোরোলিনের বাজার ছড়িয়ে পড়ে ৬০% মতন। কলকাতায় সেই বিক্রি কিছুটা কমে দাঁড়ায় ৩৫-৪০ শতাংশ মতন। শোনা যায়, স্বয়ং জওহর লাল নেহেরু নাকি প্রতিদিন বোরোলিন ব্যবহার করতেন। কারণ তিনিও স্বদেশী আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। এরপর অবশ্য পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি বোরোলিনকে। বোরোলিনের বিজ্ঞাপনে দেখা গেছে একের পর এক জনপ্রিয় অভিনেত্রীর মুখ। গোটা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে বোরোলিনের জয়জয়কার। ২০১৯ সালে ১৬০ কোটি টাকারও বেশি বোরোলিন বিক্রি হয়েছিল। আজ জিডি ফার্মাসিউটিকাল গোটা দেশজুড়ে তাদের বিভিন্ন প্রোডাক্ট বিক্রি করছে। কিন্তু সবার সেরা রয়ে গিয়েছে বোরোলিন। বর্তমানে জিডি ফার্মাসিউটিকালের দুটো ফ্যাক্টরি রয়েছে। একটি কোলকাতায়। অন্যটি গাজিয়াবাদে।
আজ দেশজুড়ে চায়নার প্রোডাক্ট বয়কট করার ডাক দেওয়া হয়। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর গলাতেও ভোকাল ফর লোকাল বা আত্মনির্ভর ভারত তৈরির কথা আমরা শুনি। কিন্তু আত্মনির্ভর ভারতের পথচলা যে শুরু হয়েছিল অনেকদিন আগেই। কলকাতার এই ব্যবসায়ী গৌরমোহন দত্তের হাত ধরেই।
বিজনেস প্রাইম নিউজ
জীবন হোক অর্থবহ