Story
দেশের স্বাধীনতার ৭০ বছর পার হয়ে গিয়েছে। এদেশের বুকে ঘটে গিয়েছে সবুজ বিপ্লব। বিপ্লব সম্পন্ন হলেও বিপ্লবের ফল এখনো পুরোপুরি পায়নি এ দেশ এ বাংলা। বিশেষত ডাল শস্য উৎপাদনে দেশের মোট চাহিদা ও যোগানের মধ্যে পার্থক্য অনেকখানি। আজও ভারত সরকারকে ফি বছর বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয় কোটি কোটি টাকার ডাল শস্য। এবার সেই ডাল শস্য উৎপাদনের এই বাংলায় যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিল বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।
প্রোটিনের ঘাটতি মেটাতে ঢাল হিসেবে ডালের খাদ্যগুন বরাবরই থাকে এগিয়ে। আর অতিমারি পরিস্থিতিতে খাদ্যগুণের বিচারে ডাল থাকা মাস্ট। কিন্তু মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ এমনকি পাশের রাজ্য বিহারে ডাল উৎপাদন করা গেলেও বাংলায় কিন্তু ডালশস্য চাষে একটা বড় রকমের ঘাটতি থেকেই গেছে। আবার এটাও ঠিক যে স্বাধীনতার ৭০ বছর পরেও এই কটা রাজ্য গোটা দেশের ডালের চাহিদা মেটাতে পারেনা। তাই বিদেশ থেকে ডালশস্য আমদানি করার ওপরেই ভরসা করতে হয় ভারতবর্ষকে।
যেখানে প্রতিদিন একজন মানুষের ডালের প্রয়োজন পড়ে ৫৫-৬০ গ্রাম সেখানে মাথাপিছু ডালের জোগান হয় ৪০ গ্রাম করে দেওয়াও সম্ভব হচ্ছে না। একইভাবে আমাদের রাজ্যে বছরে যেখানে ডালের প্রয়োজন প্রায় ১৭-১৮ লক্ষ টন, সেখানে মাত্র ৪-৪.৫ লক্ষ টন ডাল উৎপাদন করতে পারে পশ্চিমবঙ্গ। ফলে প্রয়োজনের একটা ঘাটতি থেকেই যায়। যা মেটাতে রাজ্যকে ভালো অঙ্ক খরচও করতে হয়।
তাই বাংলাতেই যদি ডালশস্য চাষ রমরমিয়ে করা যায়? তাই ডালের ঘাটতি মেটাতে এবং কম খরচে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে কিভাবে ডালচাষ করা যায় তার ওপরেই দীর্ঘ ১০ বছর ধরে কাজ করে চলেছেন বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ব বিদ্যালয়ের গবেষকরা।
যেখানে বর্তমানে চাষ করা হচ্ছে অনেক নতুন জাতের ডালের। তা সে মুসুর থেকে খেসারি বা অড়হর থেকে ছোলা, কলাই। সব ধরণের ডালশস্য এখন কৃষকরা তাঁদের নিজেদের জমিতে চাষ করছেন। আমাদের রাজ্যে যে যে জেলাগুলোতে চাষ হয় সেগুলো হচ্ছে মুর্শিদাবাদ, মালদা, নদিয়া, পশ্চিম মেদিনীপুরের কিছুটা, দুই দিনাজপুর এবং কোচবিহার। এছাড়া অন্যান্য জেলাতেও ডালশস্য চাষে কৃষকদের আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। কোন কোন ডালশস্য চাষ হচ্ছে তা আরও ভালোভাবে ব্যখ্যা করলেন বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড: রাজীব নাথ।
ইতিমধ্যেই কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা সরকারি সহায়তায় পৌঁছে গিয়েছেন প্রায় ২০ হাজার কৃষকের কাছে। তাঁদের ভালো করে বোঝাচ্ছেন, কোন জাতের ডাল চাষ করা উচিত। কোন জাতের ডাল চাষ করলে লাভবান হওয়া সম্ভব।
২০১৭-১৮ সালে ভারত সরকারের তথ্য বলছে ৪০-৪৫ হাজার কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে ৫০-৫৫ লক্ষ টন ডাল বিদেশ থেকে আমদানির জন্য। কিন্তু রাজ্যের কৃষকরাই যদি উন্নত প্রযুক্তি এবং রাজীববাবুর মত শস্যগবেষকদের কথা শুনে ডালশস্য চাষ করেন, তবে তাঁরাও যথেষ্ট লাভবান হবেন।
বর্তমানে ডালচাষে অনেক বেশি উৎসাহ দেখাচ্ছেন কৃষকরা। আগে যেখানে ১ লক্ষ ৭০ হাজার হেক্টর জমিতে ডালশস্য চাষ হত, বর্তমানে সেটা হচ্ছে প্রায় ৩ লক্ষহেক্টর জমিতে। চাষের ফলন ভালো হচ্ছে বলেই কৃষকরা উৎসাহ দেখাচ্ছেন।
২০১০-১১ সালের চেয়ে বর্তমানে ডাল চাষ আরও অনেকটাই বেশি হচ্ছে। কিন্তু তাতেও যেন রয়ে গিয়েছে চাহিদা এবং উৎপাদনের ঘাটতি। সেই ঘাটতিও মেটানো সম্ভব।
গত ৮ বছরে আন্তর্জাতিক গবেষণা কেন্দ্র ইকার্ডার সঙ্গে হাত মিলিয়ে কেন্দ্র এবং রাজ্যের আর্থিক সহযোগিতায় আজ বাংলাতেও ডালশস্য চাষ হচ্ছে ভালোরকম। যার মধ্যে অন্যতম পুরুলিয়া, বাঁকুড়া বীরভূম, পশ্চিম মেদিনীপুর, মুর্শিদাবাদ, নদিয়া, হাওড়া, হুগলি, উত্তর ২৪ পরগনা এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনা। আর বর্তমান কোভিড পরিস্থিতিতে ডালের প্রয়োজনীয়তা প্রশ্নাতীত। কারণ ডালে প্রোটিন পাওয়া যায় ২০-২৪% পর্যন্ত। এছাড়াও ডালে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে খনিজ পদার্থ পাওয়া যায়। বিশেষ করে ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ফসফরাস এছাড়াও প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন পাওয়া যায় কোভিড পরিস্থিতিতে যার প্রয়োজন সবসময়। সেক্ষেত্রে ডালশস্যের উৎপাদন যদি যথেষ্ট পরিমাণে হয় তাহলে বাংলার প্রতিটি গরিব মানুষের শরীরের প্রয়োজনীয় প্রোটিনের ঘাটতি মেটাবে ডাল। আর সেই লক্ষ্যেই এগিয়ে চলেছেন বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা।
রনি চ্যাটার্জী, নদিয়া