Daily
ওরা উত্তরবঙ্গের প্রাচীন জনজাতি ধিমাল সম্প্রদায়। শিলিগুড়ি শহর থেকে মেরেকেটে ২৫ কিলোমিটার দূরে নকশালবাড়ির নানা গ্রামে আজও কোনমতে টিকে রয়েছে এই বিলুপ্তপ্রায় জনপদ। নকশালবাড়ি ইন্দো-নেপাল সীমান্ত লাগোয়া গ্রামের নাম ধিমাল বস্তি। এখানেই ধিমাল সম্প্রদায়ের বাস। বস্তির ঘরের জানলা দিয়ে উঁকি মারলেই চোখে পড়ে ঝকঝকে পাহাড়। আবহাওয়া আর কপাল দুই-ই ভালো থাকলে দেখা মিলতে পারে শ্বেতশুভ্র কাঞ্চনজঙ্ঘারও। ভাষা, সংস্কৃতি, রীতিনীতির বিচারে সহস্র যোজন দূরে পড়ে রয়েছে তরাইয়ের এই জনপদ। ওদের সংস্কৃতি নিজস্ব। পোশাক নিজস্ব। অলঙ্কারও নিজস্ব। রয়েছে বাঁশ আর কাঠের তৈরি নিজস্ব ঘরানার বেশ কিছু বাদ্যযন্ত্র। নিজেদের মধ্যেই আপন খেয়ালে তারা তাদের সংস্কৃতি নিয়ে প্রতিনিয়ত চর্চা করে আসছে। একইসঙ্গে চলে আসছে তাদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।
ধিমালদের অস্তিত্ব রক্ষার এই লড়াইতে গর্জেনবাবুর কথা উল্লেখ না করলেই নয়। পেশায় তিনি প্রাথমিক শিক্ষক। আজ যার চেষ্টাতেই এই প্রাচীন জনপদের ৫০ শতাংশ মানুষ শিক্ষার আলো দেখেছেন। জনজাতি পেয়েছে তাদের উন্নয়ন কমিটি। আর্থিক দিক থেকে পিছিয়ে পড়া এই সম্প্রদায় আজ নতুন স্বপ্ন দেখছে। তৈরি করা হচ্ছে ট্রাইবাল মিউজিয়াম। যে জন্য ৫০ লক্ষ টাকা ধার্য করেছে রাজ্য সরকার। মিউজিয়ম হলে নতুন করে বাঁচবে ধীমালদের বাদ্যযন্ত্র, শিকারের হাতিয়ার, ওয়াল পেইন্টিং শিল্প। নতুন প্রজন্মও জানতে পারবে অনেক কিছু। শুধু ধীমালরাই নয়, গোটা এলাকাও আর্থ সামাজিক উন্নয়ন হবে। বলছেন সম্প্রদায়ের প্রধান গর্জেন মল্লিক। তিনি বলেছেন ধিমাল সম্প্রদায়ের জন্য সংস্থা করেছেন , ধিমাল জাতির আস্তিত রক্ষ্যা দল , ধিমাল লোকো সংস্কৃতি রক্ষ্যা দল করেছেন |
নকশালবাড়ির কেতুগাবুর, কিলারাম, মল্লাবারি সহ বিভিন্ন গ্রামে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ধিমালদের সংখ্যা মেরেকেটে ১০০০ জনের মত। স্বাধীনতার আগে ব্রিটিশদের সমীক্ষায় যে সংখ্যাটা ছিল ১৫ হাজারের বেশি। এই হাজার জনের মধ্যে স্নাতকোত্তর পাশ করেছেন মাত্র ৫ জন। আর মাধ্যমিক উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছেন মোট ১৬ জন। রাজ্য সরকার উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জনজাতির উন্নয়নের জন্য একের পর এক উন্নয়ন বোর্ড গঠন করলেও ধিমালরা তা থেকে বঞ্চিত বলে দাবি তুলেছেন। তাই আজ ধিমালদের ভাষা, শব্দ এবং সংস্কৃতি হারিয়ে যেতে বসেছে।
সরকারি সুযোগ সুবিধার বিচারে ধিমাল শিল্পীরা যে বঞ্চিত, সেই অভিযোগও তুললেন গর্জেনবাবু।
তবে এত কিছু অনিশ্চয়তার মধ্যে আশার আলো দেখাচ্ছে ওই মিউজিয়ামের আশ্বাসটুকু। এই মিউজিয়ম এবং অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে হাতিয়ার করে পর্যটকদের নয়া ডেস্টিনেশন হতে চলেছে ইন্দো-নেপাল সীমান্ত ঘেঁষা জনজাতিদের এই গ্রাম। পর্যটনের মানচিত্রে আসছে ধীমাল গ্রাম! ওদের বেঁচে থাকার নতুন স্বপ্ন।
অরূপ পোদ্দার
শিলিগুড়ি